কিছুদিন আগে কোনো এক পোস্টের সূত্র ধরে প্রবীর ঘোষের “আমি কেন ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না” শিরোনামে বইটির পিডিএফ ভার্শনের একটি লিঙ্ক নজরে পড়ে। ভেবে দেখলাম টাকা দিয়ে কিনে বইটা হয়তো কখনো পড়া হবে না, কাজেই এই সুযোগে একটি কপি ডাউনলোড করে রাখি। সম্প্রতি হাতে একটু সময় পেয়ে বইটি পড়ে ফেলি। বইটি পড়ার পর যা মনে এসেছে সেগুলো মোটামুটি নিম্নরূপ:
- বইটির জায়গায় জায়গায় আরজ আলী মাতুব্বরের “সত্যের সন্ধানে” নামক বইটির ছাপ নজরে পড়ার মতো। তবে আরজ আলী যেখানে প্রচলিত বিশ্বাসগুলোর উপর শুধু প্রশ্ন আর সংশয় প্রকাশ করে ছেড়ে দিয়েছেন, প্রবীর ঘোষ সেখানে সেগুলোর জবাব দেয়ারও চেষ্টা করেছেন।
- বইটিতে মূলত হিন্দু ধর্ম, ইসলাম, খ্রীষ্ট ধর্ম, এবং এই তিন ধর্মের অনুসারীদের বিশ্বাস ও কার্যকলাপ নিয়ে সমালোচনা এসেছে। কোথাও কোথাও তিনটি ধর্মকে একত্রে গুলিয়ে ফেলে, কোথাও বা আবার খ্রীষ্ট ধর্ম ও ইসলামকে একত্রে খিচুড়ি পাকিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়েছে যাতে অজ্ঞ-অসচেতন পাঠকদের কাছে মনে হতে পারে এগুলো ইসলামেও আছে। এই অংশগুলোতে প্রবীর ঘোষের উপস্থাপনাকে ‘ভণ্ডজিৎ মার্কা’ উপস্থাপনা বলেই মনে হয়েছে, যদিও আমি প্রবীর ঘোষকে ভণ্ডজিতের মানসিকতার মনে করি না।
- বইটি পড়ার সময় নাস্তিকতা ও ইসলাম নিয়ে ব্লগীয় নাস্তিকদের যুক্তিগুলোও বেশ পরিচিত পরিচিত মনে হচ্ছিল! উল্লেখ্য যে, প্রবীর ঘোষের এই বইটা প্রকাশিত হয়েছে ১৯৯৬ সালে আর ব্লগীয় নাস্তিকরা লেখালেখি শুরু করেছে তার অনেক পরে।
- বইটিতে ধর্ম ও ধর্মে বিশ্বাসীদের সমালোচনা করা হলেও নাস্তিকতা ও নাস্তিকরা সকল প্রকার সমালোচনার ঊর্ধ্বে থেকে গেছে। উল্লেখ্য যে, প্রবীর ঘোষ-সহ তার যুক্তিবাদী সংগঠনের সদস্যদের সকলেই মার্ক্সবাদী ঘরানার। এজন্য প্রবীর ঘোষের লেখাতে মার্ক্সবাদ ও কম্যুনিজমের কোনো সমালোচনাও দেখা যায় না।
যাহোক, প্রবীর ঘোষের এই বইটিতে অন্যান্য ধর্ম নিয়ে কী বলা হয়েছে না বলা হয়েছে সেগুলো সেই ধর্মের অনুসারীদের দেখার বিষয়। সেই ধর্মের অনুসারীরা যদি কিছু না বলে তাহলে বুঝতে হবে প্রবীর ঘোষ অন্যান্য ধর্ম নিয়ে যা বলেছেন সেগুলো আসলে সঠিক তথ্যের উপর ভিত্তি করেই বলা হয়েছে। এজন্য এই পোস্টে ইসলাম নিয়ে প্রবীর ঘোষের কতিপয় বক্তব্য (তার বই থেকে সরাসরি স্ক্রীনশট) তুলে ধরা হবে।
১. প্রবীর ঘোষ বলেছেন, "ইসলামে ও খ্রিস্ট ধর্মে বিশ্বাসীরা মনে করেন পৃথিবীর আদি মানুষ আদমের জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৪০০৪ সালে।" তারপর কিছু তথ্য তুলে ধরে শেষে প্রশ্ন করেছেন এভাবে, "এরপরও পবিত্র বাইবেল ও পবিত্র কোরআন-এর কথামত খ্রিস্টপূর্ব ৪০০৪ সালে পৃথিবীতে প্রথম মানুষ তত্ত্ব বা তথ্যকে আমরা মানি কী করে?"
ওয়েল, কোরআন বা এমনকি হাদিসেরও কোথাও যেমন "আদমের জন্ম খ্রিস্টপূর্ব ৪০০৪ সালে" জাতীয় কথাবার্তা লিখা নেই তেমনি আবার মুসলিমরাও এমন কিছুতে বিশ্বাস করে না। প্রবীর ঘোষ তাহলে কোরআনের মধ্যে এই তথ্য পেলেন কোথা থেকে!?
২. নিচের স্ক্রীনশটে প্রবীর ঘোষের বক্তব্য অনুযায়ী আদমের জন্মের ১৬৫৬ বছর (?) পর মহাপ্লাবন (?), ঈশ্বর পৃথিবীকে (?) পাপমুক্ত করতে ও জীবজগৎকে (?) ধ্বংস করতে মহাপ্লাবন এনেছিলেন, জীব বলতে প্রাণী ও উদ্ভিদ (?) সবই, ইত্যাদি আগডুম-বাগডুম মার্কা কথাবার্তা কোরআন বা হাদিসেরও কোথাও লিখা নেই। প্রবীর ঘোষ তাহলে এই তথ্যগুলো পেলেন কোথা থেকে?
৩. নূহের প্লাবন সম্পর্কে নিচের স্ক্রীনশটে প্রবীর ঘোষ যা কিছু বলেছেন সেগুলোর সবই বাইবেলের কথা। অথচ সেগুলোকে মুসলিমদের বিশ্বাসের নামেও চালিয়ে দেয়া হয়েছে! এ কেমন অসততা!
প্রশ্ন হচ্ছে- ইসলাম ও মুসলিমদের বিশ্বাসের নামে এইসব আবল-তাবল কথাবার্তা চালিয়ে দিয়ে প্রবীর ঘোষ ঠিক কী প্রমাণ করতে চেয়েছেন?
৪. প্রবীর ঘোষের দাবি অনুযায়ী ইসলামের বেহেশত শুঁড়িখানা আর বেশ্যাপল্লী বই কিছুই নয়। কোরআন থেকে চেরী পিকিং করে কিছু আয়াতও তুলে ধরা হয়েছে। অথচ প্রবীর ঘোষ যদি সৎ উদ্দেশ্যে কোরআন পড়তেন তাহলে দেখতে পেতেন যে, কোরআনে উল্লেখিত কথিত হুরীদের সাথে জান্নাতী পুরুষদের বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ করিয়ে দেয়া হবে (সূরা আত্ব তূর ৫২:২০)। অর্থাৎ জান্নাতী পুরুষ ও কথিত হুরীরা স্বামী-স্ত্রী হিসেবে থাকবে। বেশ্যাপল্লীতে কি বিবাহিত স্বামী-স্ত্রীরা বাস করে, প্রবীর ঘোষ? 'বেশ্যাপল্লী'র সংজ্ঞা কি প্রবীর ঘোষের জানা নাই?
৫. ইসলাম সম্পর্কে প্রবীর ঘোষের আরো অজ্ঞতা দেখুন-
খ্রিস্টপূর্ব ৪০০৪ সালে আদমের জন্ম? এইটা কাদের বিশ্বাস, প্রবীর ঘোষ? আর কোরআনের একাধিক আয়াতে পরিষ্কার করেই বলা হয়েছে যে, প্রত্যেক জাতির মধ্যে নবী-রাসূল পাঠানো হয়েছিল।
৬. ইসলামে নারীদের মর্যাদা ও অধিকার নিয়ে প্রবীর ঘোষের চরম অপব্যাখ্যা দেখুন-
প্রবীর ঘোষ'রা যখন নিজ ধর্ম ত্যাগের ঘোষণা দিয়ে 'নারীবাদী' সাজেন তখন তারা কতটা ভয়ঙ্কর হয়ে উঠতে পারেন, তার সামান্য নমুনা উপরের বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে। প্রবীর ঘোষের বইটাতে ইসলাম সম্পর্কে এই ধরণের ভুল/মিথ্যা তথ্য ও অপব্যাখ্যামূলক কথাবার্তা আরো আছে। এখানে কয়েকটি উল্লেখ করা হয়েছে মাত্র। সময় অভাবে সবকিছু তুলে ধরা সম্ভব নয়। আগ্রহী পাঠক বইটা পড়ে দেখতে পারেন।







এস. এম. রায়হান
ফেব্রুয়ারি ২৩, ২০১৫ at ১১:৩০ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
বইটার ডাউনলোড লিঙ্ক নিচের লিঙ্কেও পাওয়া যাবে-
http://www.amarboi.com/2013/06/ami-keno-ishware-bishwas-kori-na-probir-ghosh.html
সজল আহমেদ
ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৫ at ৩:০৫ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
ভাই স্ক্রীনশর্টে যা পড়লাম ঠিক এইসব নিয়েই বাংলাব্লগের পাতি নাস্তিকরা লাফায়। ভাই এই বইটার আরো ভুলগুলো পর্ব আকারে দিলে ভাল হয়। কারণ এই বইটা আমি পড়তে চাইনা তাই অনুরোধ করছি আপনাকে। এমনিতেই প্রায় অনেক দিন আল্লাহ'কে বিশ্বাস নিয়ে সংশয়ে ছিলাম, আল্লাহ্'র রহমত, সদালাপের লেখার দরুণ আমার বিশ্বাস ফিরেছে তাই চাইনা আবার সংশয়বাদী হতে…
নির্ভীক আস্তিক
ফেব্রুয়ারি ২৪, ২০১৫ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
এই ঘোষদের(মার্ক্সবাদী নাস্তিক) মধ্যে কিছু চরিত্র ঘষেটি বেগমের মত আর কিছু হচ্ছে মীর জাফরের মত। কিছু আছে তসলিমা নাসরীনদের মত আর কিছু হচ্ছে হূমায়ন আযাদের মত। অনেক ভালও আছে, তবে এরা আবার নিজ সম্প্রদায়ের দিকে অভাবে তাকাতে চাননা। সরম পান হয়তোবা।
শাহবাজ নজরুল
ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৫ at ১২:৫১ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
এই কি সেই প্রবীর ঘোষ যিনি যুক্তির জাহাজ হিসেবে পরিচিত? তার যুক্তির ঠ্যালায় নাকি অনেকের চোখের সামনে থেকে অন্ধকারের ঠুলি উবে গেছে। ভাবীজিতকে অনেক বারই এই প্রবীর ঘোষ সম্পর্কে উচ্ছসিত প্রশংসা করতে শুনেছি। এই যদি তার যুক্তি আর বিদ্যার নমুনা হয় -- তাহলে যুক্তি নিজেই যে গলায় ফাঁস দিয়ে মরবে।
ফেব্রুয়ারি ২৫, ২০১৫ at ১১:২২ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
আর বলেন না! এই সেই প্রবীর ঘোষ, ভারতীয় বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী সমিতির প্রতিষ্ঠাতা। ঈশ্বরে অবিশ্বাসের পক্ষেও উনার হাস্যকর কিছু যুক্তি আছে। তবে লোক হিসেবে মনে হয় খারাপ না। বিভিন্ন কুসংস্কারের বিরুদ্ধে গণসচেতনতা তৈরীতে বাস্তবিক কিছু অবদানও আছে। তবে ইসলাম তথা চরম সত্যের মুখোমুখি হলে আর দশ জনের যে অবস্থা হয়, উনারও একই অবস্থা হয়েছে আরকি। উনি অন্যান্য বিষয়ে মোটামুটি সততা ও নিষ্ঠার পরিচয় দিলেও ইসলামের ক্ষেত্রে এসে ভণ্ডজিৎ রায় থেকে নিজেকে সেভাবে আলাদা করতে পারেননি।
Shahriar
ফেব্রুয়ারি ২৭, ২০১৫ at ১:১৬ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
Good
rimon444
মার্চ ৫, ২০১৫ at ৭:৩০ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
ভাই ,আপনার মেইল অ্যাড্রেস টা একটু দেন।
Izmamul Haque
মে ৭, ২০১৫ at ১:১২ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
Mobile theke ki lekha pathano jete pare ?
এস. এম. রায়হান
জানুয়ারি ২২, ২০১৬ at ১:৫৪ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
অনেকেই হয়তো জানেন যে, মুক্তমনা ব্লগের পশ্চিম বাংলার ব্লগার 'ঈশ্বরহীন' ওরফে সামির খুব অল্প বয়সে হঠাৎ করে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যার কারণে অভিজিৎ-সহ তার পূজারীরা তাকে পুরোপুরি ভুলে গেছে! যাহোক, সে জাকির নায়েকের সাথে প্রবীর ঘোষের বিতর্কের আয়োজন নিয়ে একটি পোস্ট দিয়েছিল। তার সেই পোস্ট এই লিঙ্কে পাওয়া যাবে। অভিজিতের মস্তকধোলাই পূজারীদের মন্তব্যগুলোও লক্ষণীয়। পোস্টটা নিচে কপিপেস্ট করা হলো-