«

»

Feb ২০

আবারো কি সেই পুরোনো ভুলটাই করা হচ্ছে!

বাংলাদেশের চলমান গনজাগরণের দ্রুত পরিবর্তনশীল দৃশ্যপটের পাশাপাশি দীর্ঘদিন ধরে লদ্ব অভিজ্ঞতাকে মিলিয়ে দেখতে গিয়ে বারবার একটা বড় দীর্ঘশ্বাস বের হয়ে যায় – সংখ্যাগুরু ইসলামের অনুসারীদের দেশে ইসলাম বারবার সংখ্যালঘু মতবাদের কাতারে চলে যাচ্ছে। বর্তমান গনজাগরণের মুল দাবী যদিও ১৯৭১ সালের মানবতারবিরোধীদের বিচার এবং তাদের সুষ্পষ্ট ভাবে দৃশ্যপট থেকে বিদায়ের উপরই কেন্দ্রিভুত – কিন্তু তার পাশাপাশি চলে আসছে ধর্ম ( মুলত ইসলাম ধর্ম) নির্ভর রাজনীতির বিষয়টি। যে দেশে ৯০ ভাগ মানুষ একটা মতাদর্শ অনুসরন করে তাকে রাজনীতি থেকে দুরে রাখার জন্যে রাষ্ট্রকে আইন করার মতো দাবী করার যে পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে – আমি মুলত সেই বিষয়টা চিন্তা করেই ব্যথিত হই – লজ্জিত হই – ভাবি আমাদের অর্থাৎ ইসলামের অনুসারীদের ব্যর্থতা কোথায়?

 
 
শুরুতেই একটু ভিন্ন বিষয় টেনে আনতে চাই – ব্লগার রাজীব (থাবা বাবা) খুন হয়েছে। পরিবেশ পরিস্থিতির আলোকে সকল আগুল একটা দিকেই নির্দেশনা দিচ্ছে – জামাত/শিবির এই কাজ করেছে। জামাত/শিবিরের পূর্ববর্তী অপকর্ম আর চলমান অনলাইনে তাদের অবস্থান এই ঘটনার জন্যে তাদের দায়ী করার মতো যথেষ্ঠ যুক্তি যোগান দেয়। সেই দিকে যাচ্ছি না – যে বিষয়টি আমাকে ব্যথিত করেছে – তা হলো থাবা বাবা নামক ব্লগারের সাথে ধর্ম নিয়ে বিতর্ক করেছে – তখন মনে রেখেছি “লাকুম দ্বী নুকুম ওয়া লী আদদ্বীন” – তারপর  তার মৃত্যু পর জানতে পারলাম সে একজন মুসলিম পরিবারে জন্ম নেওয়া মানুষ – নাম রাজীব হায়দার। তার মামা জুম্মা নামাজ পড়ে এসে ভাগ্নেকে খেতে ডাকছে – তারমানে ইসলাম ধর্মের পরিবেশ থেকে সে খুব দুরে ছিলো না। কিন্তু কিসের প্রভাবে সে নাস্তিক হিসাবে নিজেকে পরিচিত করতে চাইলো? নানান জন নানান ভাবে হয়তো বিষয়টা ব্যাখ্যা করবেন। নানান বিষয়ে দোষারোপ করবেন। কিন্তু যে দেশের জন্মের পর থেকেই মোটামুটি ৭০% সময় রাজদন্ড ধরে রেখেছিলো ধর্মকে ভিত্তিকে করে রাজনীতি করা দল বা গোষ্ঠী আর মাত্র ৩০% বছর রাজদন্ড ছিলো তথাকথিত ধর্মনিরপেক্ষতার সমর্থকদের হাতে  - সেখানে রাজীবের থাবা বাবা হয়ে যাওয়ার পিছনে রাষ্ট্রের ভুমিকা কতটুকু ছিলো? ধর্ম নিয়ে রাজনীতি করা দল বা গোষ্ঠীর ব্যর্থতা নাকি ধর্মকে পুঁজি করে ক্ষমতা ভোগকারী ব্যক্তিবর্গ বা গোষ্ঠী নাকি এইটা ধর্মনিরপেক্ষ – যারা মুলত সংখ্যালঘু – তাদের বিজয়?
 
 
এই বিষয়টি বিচারে আগে নিজের কথা কিছুটা বলতে চাই – ছোট বয়স থেকেই ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোকে অপছন্দ করতাম। এই অপছন্দ কাউকে শেখাতে হয়নি –১৯৭১ সালে ছোট বয়সেই দেখেছে ধর্ম ভিত্তিক রাজনীতি করা লোকজন শান্তিকমিটি আর রাজাকার রূপে তার পরিবারের উপর অত্যাচার করেছে। যার মাকে লাথি দিয়ে সিঁড়ি থেকে ফেলে দিলে যে কোন ছেলের জন্যে অত্যাচারী লোকটির ছবি মনে গেঁথে থাকে অত্যান্ত ঘৃনার সাথেই – বলাই বাহুল্য দাঁড়িটুপি আর ধর্মও সেই ঘৃনার সাথেই মিশে গিয়েছিলো। তাই ছাত্রজীবনে মুলত ধর্মকেই এড়িয়েই চলতাম – ভাবতাম এই লোকগুলো আসলে জঘন্য অত্যাচারী। যদিও এক সময় ধরতে পারলাম আমি যা জানি তা পুরোটাই সত্য নয়। বুঝতে শিখলাম ৭১ এর নির্মমতার জন্যে দায়ী ইসলাম নয় – মুসলমান নামধারী কিছু অমানুষ। জানলাম ইসলাম মুলত অত্যাচারিতে পক্ষে অর্থাৎ ন্যায় বিচারের পক্ষে কঠিন অবস্থান নেয়।  মজলুমের জন্যে ইসলাম যথেষ্ঠ সহমর্মীতার মনোভাব দেখিয়েছে – আল্লাহ বলছেন - 
(42:41) নিশ্চয় যে অত্যাচারিত হওয়ার পর প্রতিশোধ গ্রহণ করে, তাদের বিরুদ্ধেও কোন অভিযোগ নেই। 
 
সুতরাং একজন মজলুম হিসাবে আমি প্রতিশোধের অনুমোদন পেয়ে যাই। কিন্তু পরের আয়াত সেই প্রতিশোধ ষ্পৃহা থেকে আমাকে বিরত করে - 
 
(42:43)
অবশ্যই যে সবর করে ও ক্ষমা করে নিশ্চয় এটা সাহসিকতার কাজ।
 
নিজের সাথে যুদ্ধ করি – ক্ষমা করাই যদি শ্রেয়তর কাজ হয় – তবে ক্ষমা করে দিতেই হয় – সেইটা আমার জন্যে ভাল।
 
 
কিন্তু কাকে ক্ষমা করবো? গনহত্যার মতো নিকৃষ্ট কাজ করেও যারা ক্ষমা চায়নি – তাদের ক্ষমা করার সুযোগ কোথায়? যারা মুসলিম হয়ে মুসলিম নারীকে ধর্ষণ করে বা করার জন্যে পাকিস্তানীদের পথ দেখিয়ে নিয়ে গেছে – সহায়তা করেছে - তাদেরকে ক্ষমা করার সুযোগ কোথায়?
ধীরে ধীরে আরো জানতে পারি – আমার প্রিয় মানুষটি; যিনি মানবজাতির জন্যে একজন রোলমডেল হিসাবে সব ধরনের উদাহরন রেখে গেছেন – সেই মহাপুরুষ মুহাম্মদ (সঃ) মহানুভবতায় এবং উদারতার ছিলেন একজন উজ্জল নিদর্শন – কিন্তু তিনিও মক্কা বিজয়ের পর সাধারন ক্ষমার আওতায় সকল বিরোধীদের ক্ষমা করে দিলেন – কিন্তু যাদের বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অপরাধের অভিযোগ ছিলো – তাদের জন্যে চরম শাস্তি নির্ধারন করে দিলেন। এখানে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন যে – মক্কা বিজয়ের পর সাধারন ক্ষমাপ্রাপ্ত কাফেররা রসুল (সঃ) এর পথ অনুসরনের জন্যে আনুগত্য স্বীকার করেছিলেন – তাদের কেউই মসজিদুল হারামে তাদের এতোদিনের উপাস্য মুর্তিগুলো পুনস্থাপনের জন্যে গোপন বাহিনীও তৈরী করেনি বা মনে মনে বিশ্বাসও ধরে রাখেনি যে তাদের আবারো মূর্তি পুঁজায় ফিরে যেতে হবে। তারা তাদের ভুল স্বীকার করে অনুতপ্ত হয়েছিলেন এবং রসুল (সঃ) এর আনুসারী হয়ে ছিলেন। পরবর্তীতে ইসলামের জন্যে তাদের অনেকের অবদান ছিলো অসাধারন।   
 
 
কিন্তু আমরা যদি ৭১ সালের তথাকথিত ইসলামী পতাকাধারীদের ভুমিকা দেখি তাহলে দেখবো তারা শুরু থেকে উল্টা রাস্তায় হেটেছে। ২৫ শে মার্চে পাকিস্তানী সেনাবাহিনী গনহত্যা শুরু করলে – বাংলাদেশের ইসলাম পন্থীরা প্রথম ভুলটা করে বসে পাকিস্তানী সেনাবাহিনীকে সমর্থন দিয়ে – তারা মজলুমের  পক্ষ না নিয়ে জালেমদের পক্ষাবলম্বন করে একের পর এক ভুল করতে থাকে। যুদ্ধকালীন সবচেয়ে জঘন্যতম অন্যায় হয়ে থাকে সংখ্যালঘু আর নারীদের উপরে – বাংলাদেশেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। ১ কোটি সংখ্যালঘু তাদের বাস্তুভিটা ত্যাগ করে পার্শ্ববর্তী দেশে পালিয়ে গিয়েছিলো। অন্যদিকে আজও দেশে বিদেশে শত শত যুদ্ধশিশু তৎকালীন সময়ে নারীদের উপর অত্যাচারের চিহ্ন বহন করছে। 
খুবই পরিতাপের বিষয় হলো এই সকল অপকর্ম এবং জঘন্য অপরাধের প্রতিবাদ করার কথা সেখানে ইসলামপন্থীরা নেতৃত্ব সেই অপরাধকে সক্রিয়ভাবে সমর্থন এবং সহায়তা করেছিলো। পরবর্তীতে ইসলামের দৃষ্টিতে কঠিন শাস্তিযোগ্য অপরাধে অপরাধীদের সংগঠনগুলোকে দেশে সুপ্রতিষ্ঠিত হতে যারা সহায়তা করেছে তারা শাসন করার জন্যে ইসলামেই দোহায়ই দিয়েছিলো। 
 
সব মিলিয়ে বিগত চারদশকে বাংলাদেশের ইসলামের নামে একদল জঘন্য অপরাধী বুক ফুলিয়ে হেঁটেছে – তারা বিচারকে অস্বীকার করেছে এবং বিচার প্রার্থীদের উপর চড়াও হয়েছে। যাদের কর্মকান্ড ছিলো ইসলামের শিক্ষা বিপরীত। 
 
অন্যদিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠী – যারা ইসলামকে তাদের জীবন বিধান মেনে চলার চেষ্টা করে – তারা একটা কৃত্রিম ভীতির মধ্যে থেকে এতোবড় অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে ব্যর্থ হয়েছে। ৭১ সালে সকল ঘৃন্যকাজগুলোর বিচারের মিছিলে সকল ভিকটিম শামিল হলেও – সেই মিছিলে নাস্তিক, হিন্দু বা কমিউনিস্টদের উপস্থিতি দেখে একদল মানুষ সেখান থেকে নিজেদের সরিয়ে রাখছে। ভাবতেও অবাক লাগে ৯০ ভাগ ইসলামের অনুসারীরা দেশে ইসলামের নামে রাজনীতি করা দলগুলো কিভাবে স্যংখ্যালঘু সম্প্রদায় আর একদল হাতে গোনা নাস্তিকের দলকে প্রতিদ্বন্দী বিবেচনা করছেন। এর কারনটা হয়তো এইটাই যে সংখ্যালঘু আর নাস্তিকের দলই আসলে ন্যয়ের পক্ষে কথা বলছে ফলে সংখ্যাগুরু অন্যায় জেনেও চুপ করে থাকা ছাড়া পথ খুজে পাচ্ছে না। দৃশ্যত ইসলামপন্থী দলগুলো নিজেদেরকে ন্যয়ের পক্ষে দাঁড় করাতে ব্যর্থ হয়ে উল্টো বিচারের পক্ষের বিরুদ্ধে নানান অজুহাত খুঁজছে। তার সবচেয়ে বড় প্রদর্শনী হয়ে যাচ্ছে এখন – ৪২ বছরের বকেয়া বিচারের বিষয়ে সম্পূর্ন নিশ্চুপ আলেমরা কয়েকজন ইসলাম বিদ্ধেষী ইন্টারনেটে লেখার বিরুদ্ধে রাস্তায় নামছে – যে লেখা পড়ার কোন সুযোগই হয়তো বাংলাদেশের সাধারন মানুষদের হতো না। তাদের কারনে সাধারন মানুষ একটা কাজে পারদর্শী হয়ে উঠছে – তা হলো অদৃশ্যশত্রুকে ঘৃণা করা। 
 
ইসলামতো ন্যায়ের কথা বলে, ইসলামতো বিচারের কথা বলে। এমনকি সুষ্পষ্ঠভাবে হত্যা-লুটপাট-ধর্ষনের জন্যে কঠিন শাস্তির কথা বলে। তাহলে কি কারনে আজ পর্যন্তও সন্মিলিত ভাবে বা ইসলামের নামের সংগঠন করা গোষ্ঠী ৭১ এর জঘন্য অপরাধের বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে পারলো না? 
কোরানের আল্লাহ তালা বলেন -  
 
"এ কারণেই আমি বনী-ইসলাঈলের প্রতি লিখে দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবাপৃথিবীতে অনর্থ সৃষ্টি করা ছাড়া কাউকে হত্যা করে সে যেন সব মানুষকেই হত্যা করে। এবং যে কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সবার জীবন রক্ষা করে। তাদের কাছে আমার পয়গম্বরগণ প্রকাশ্য নিদর্শনাবলী নিয়ে এসেছেন। বস্তুতঃ এরপরও তাদের অনেক লোক পৃথিবীতে সীমাতিক্রম করে।" (৫:৩২)
 
যারা ইসলামের ব্যানারে রাজনীতি করতো ৭১ এ – তাদের সবার এই কথাগুলো জানা থাকার পরও কিভাবে এরা দলীয়, ধর্মীয় বা মতাদর্শের পার্থক্যের কারনে চিহ্নিত করে গনহত্যা করেছে বা করার জন্যে উদ্বুদ্ধ করেছে।  – কিভাবে নিরাপরাধ নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছে এবং হত্যাকে সমর্থণ এবং সহায়তা দিয়েছে! সেই কারনে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে - যারা সেই অপরাধের সাথে জড়িত ছিলো তাদের অপরাধের বিষয়ে বাংলাদেশের আলেমসমাজ বস্তুত নীরব ভূমিকাই নিয়েছিলো এবং আজও সেই ভুমিকায়ই আছেন। 
 
কিন্তু ইসলামের বিধান হলো – 
 
(5:8) হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশে ন্যায় সাক্ষ্যদানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ন্যায়বিচার পরিত্যাগ করো না। সুবিচার কর এটাই খোদাভীতির অধিক নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর। তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত। 
 
এখানে কি বলা হয়েছে যে হিন্দু, (রাম-বাম) বামপন্থী, কাদিয়ানী বা নাস্তিক যদি বিচারপ্রার্থী হয় – তবে আমরা তার বিচারের বিষয়ে অনীহা জানাবো। আমরা মিথ্যার পক্ষে দাড়াবো। 
 
বরঞ্চ বলা হয়েছে – 
 
হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বল।(৩৩:৭০)
 
এই হলো কোরানের শিক্ষা। 
 
(৩)
 
ধীরে ধীরে শিখতে লাগলাম। আরো অবাক হয়ে গেলাম কি একটা দ্বৈত চরিত্র ধারন করে আছি আমরা – ধর্মের নামে সবচেয়ে বড় অধর্মগুলোকে অবলীলায় হজম করছি। মুসলিম জাতীয়তাবাদের নামে একটা দেশ সৃষ্টি হলো – (যদিও জাতীয়তাবাদ ইসলামের দৃষ্টিতে একটা ঘৃনিত মতবাদ) – সেখানে ধর্মের নামে শুরু হলো শোষন এবং জুলুম। এমনকি ভাষার জন্যে সংগ্রামরত মানুষগুলো বিপরীতে দাড়িয়ে গেলো ইসলামের নাম নিয়ে একদল। অবশেষে  মানুষ যুদ্ধ করলো সেই শোষন থেকে মুক্তির – সেই মুক্তির সংগ্রামকেও দমন করার চেষ্টা করা হলো ধর্মের নামে। বলা হলো “পাকিস্তান আল্লাহর ঘর” – সেই আল্লাহ ঘর রক্ষার জন্যে করা হলো গনহত্যা, ধর্ষন, লুট অগ্নি সংযোগ। আমরা দেখলাম ইসলামকে সেই স্বাধীকার সংগ্রাম আর জালেমদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের বিপরীতে ফতোয়া এলো - *গোলাম আযম বলেন, কোন ভাল মুসলমানই তথাকথিত বাংলাদেশের আন্দোলনের সমর্থক হতে পারে না। রাজাকাররা খুব ভাল কাজ করছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন"
 
 
(দৈনিক সংগ্রাম/ ০২ অক্টোবর, ১৯৭১)
 
আরো দেখুন - 
 
 
অবাক হলাম আমাদের নেতাদের এই কোরান সুন্নাবিরোধী কাজগুলোর দিক থেকে নজর সরিয়ে কৃত্রিম শত্রু হিসাবে রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দী বা ভিন্ন ধর্মের বা সম্প্রদায়ের দিকে মানুষের নজর সরিয়ে দেওয়ার নিরন্তর প্রচেষ্টা। তাদের কর্মকান্ডে মনে হলো এরা আল্লাহর চেয়ে বেশী ভয় পায় নাস্তিক, হিন্দু, ভারত, আওয়ামীলীগ ও কমিউনিস্ট দলগুলোকে। এরা ভুলেও কোরানের শিক্ষাকে মানুষের সামনে তুলে ধরে না; বিশ্বের ইতিহাসে একটা ভয়াবহ গনহত্যর সাথে ইসলামের নাম জড়িয়ে যারা জঘন্যতম অপরাধ করেছিলো তাদের শাস্তি দাবী করলো না। 
 
বরঞ্চ দিনেদিনে ইসলামের নামে ক্ষমতার বানিজ্য জমজমাট হয়ে উঠলো, একজন অবৈধ সামরিক শাসক ইসলামের কা্ন্ডারী সেজে এসে সংবিধানে বিসমিল্লাহ যোগ করলেন – কিন্তু ইসলামের হারাম যে মদ্যপান তার লাইসেন্সও দিতে থাকলেন – মদ,জুয়া, যাত্রা, ইত্যাদির ব্যাপক প্রসার হলো তার শাসনমলে – তারই উত্তরসুরীদের দূর্নীতি আর লুটপাট এখনও বাংলাদেশের মানুষের কাছে একটা বিষ্ময়। কিন্তু এরাই ইসলামের নাম ব্যবহার করেছে এবং ৭১ এর জঘন্য অপরাধের সাথে জড়িতদের প্রতিষ্ঠিত করেছে। পরে আরেকজন অবৈধ সামরিক শাসক এসে ইসলামকে রাষ্ট্রধর্ম করে নিজেকে ইসলামের সেবক হিসাবে ঘোষনা দিলেও তার শাসনামলে ইসলামের বিধিবিধান সবচেয়ে বেশী লংঘিত হয়েছে – ঘুষ-দূর্নীতি হয়ে মহামারী রূপে – আর রাষ্ট্রীয় উচ্চপদে বসে ব্যাভিচার নজিরতো খুব কমই পাওয়া যাবে এই বিশ্বে। তারা দুইজনই বাংলাদেশের ইসলামের ঝান্ডা তুলে ধরা দলগুলোর সমর্থণ ও সহায়তা পেয়েছে। 
তারপর দেখেছি ইসলামের নাম ব্যবহার করা শুরু করেছে প্রায় সকল রাজনৈতিক দলই। একদল নিজেদের সৎলোক দাবী করে এসে ক্ষমতার ভাগ বসিয়ে ভুলে গেলো ইসলামের মুল বিধান গুলো – দেশে পতিতাবৃত্তির লাইসেন্স দেবার মতো নিন্দনীয় কাজগুলো হলো ইসলামের ধ্বজাধারী বলে কথিত এক নেতার মন্ত্রনালয়ে। 
 
সুতরাং দেখছি বাংলাদেশের জন্মের পর থেকে ৭০ ভাগ সময় শাসনক্ষমতায় ছিলো ইসলামের নামে রাজনীতি করা গোষ্ঠী বা দল। এখন যদি কেউ প্রশ্ন করে – ইসলামের কি লাভ হয়েছে ইসলামের নামে শাসনের এই সময়গুলো থেকে? উত্তর দেওয়া জন্যে ভাল কিছু খুঁজে বের করার জন্যে রীতিমতো গবেষনা করতে হবে বটে। 
 
পক্ষান্তরে ইসলামের নামে গনহত্যা-ধর্ষন- লুট-অগ্নিসংযোগের যে রীতি চালু করেছিলো পাকিস্তানী সেনাবাহিনী আর তাদের দেশীয় দোসর রাজাকার আলবদর গোষ্ঠী – তারই কিছু নমুনা পরেও দেখেছে বাংলাদেশের মানুষ। হরতুল জেহাদ, জেএমবি ইত্যাদির নামে বোমাবাজি করে নিরাপরাধ মানুষ হত্যা কোন ইসলামের বিধান তা মানুষকে ভাবিয়েছে। ইসলামের নামে বিরোধীদের উপর বোমা হামলা, গ্রেনেট হামলা করে যে সন্ত্রাসের জন্ম দিয়েছিলো একদল মানুষ – তারও প্রতিবাদ করতে ব্যর্থ হয়েছে ইসলামী নেতারা – তারা তাদের রক্ষার চেষ্টা করেছে নতুবা বোমা হামলার ক্সতিগ্রস্থদের মিথ্যাবাদী প্রমানের চেষ্টা করা হয়েছে – বাংলাভাই মিডিয়ার সৃষ্টি বলে বক্তব্য দিয়ে। 
 
 
প্রকৃতপক্ষে দেখা যাচ্ছে – ইসলামের নামে রাজনীতির একটা ভুল যাত্রা শুরু হয়েছিলো পাকিস্তানের জন্মের পর থেকেই। পাকিস্তান জন্মের পরপরই যখন মুসলিম লীগের নেতৃত্ব চলে যায় ইংরেজ দালাল রায় বাহাদুর খান বাহাদুরদের হাতে – তারা ইসলামকে ব্যবহার শুরু করে তাদের ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে। এমনকি বাংলা ভাষার বিরুদ্ধে দাড়ানোর সময়ও তারা ইসলামের দোহাই দিয়ে উর্দ্দুতে প্রাধান্য দিতে চেয়েছিলো। তাদের প্রচেষ্টা ব্যর্থ হলেও – পরবর্তীতে আমাদের মানসিকতা থেকে ইসলামবিরোধী একটা জুজুর ভয় কাঁটতে দেওয়া হয়নি। আজও দেখি শিবিরের মিছিল থেকে বাসে আগুন দিচ্ছে “আল্লাহু আকবর” ধ্বনী দিয়ে – বাসে বসে থাকা ভীত মানুষটির জন্যে এইটা একটা ভুল বার্তা দিচ্ছে ইসলামের নামে রাজনীতি করা লোকজন। 
সেই যে ইতিহাসের ভুল দিকে অবস্থান করা শুরু হয়েছিলো – আজও তার থেকে বের হতে পারছি কি আমরা? যখন বাংলাদেশের তরুন প্রজন্ম বিচারের দাবীতে এক হচ্ছে – আমরা সেখানে নাস্তিক-হিন্দু-বামের উপস্থিতি আবিষ্কারের চেষ্টা করছি। আমরা কেন সেখানে গিয়ে আল্লাহু আকবর ধ্বনি দিয়ে বিচারের দাবী করতে পারলাম না? ইসলামের পন্ডিত ব্যক্তিরা কেন বিচারের দাবীতে সুষ্পষ্ট বক্তব্য দিতে অনীহ। অন্যদিকে শোলাকিয়ার ইমাম যখন দাবীর পক্ষে বক্তব্য দিলেন – উনাকে অপদস্থ করার জন্যে উঠেপড়ে লেগে গেলাম। আমরা কেন গনহত্যা-ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধের জন্যে কোরানের শাস্তির বিধানের কথা জনসমুখে প্রচার করতে পারলাম না? 
 
আমাদের ইতিহাসের ভুল দিকে অবস্থানে টেনে রেখেছে আমাদের পূবপুরুষদের ভুল বা ইচ্ছাকৃত গনবিরোধী সিদ্ধান্ত – যার থেকে আমরা বের হওয়ার মতো সৎসাহস দেখাতে ব্যর্থ হয়েছি। যে বাংলাদেশে ৯০ ভাগ ইসলাম ধর্মের অনুসারী – সেখানে ৭১ এর মতো একটা গনহত্যার বিচারের দাবীর সমাবেশে ইসলামের শিক্ষার কথা বলার মতো মানুষগুলো অনুপস্থিত – সেই সুবাদে নাস্তিক-বামরা নেতৃত্ব নিয়ে নিচ্ছে – সেখানে আমরা নিরাপদ দুরে বসে ইসলাম রক্ষায় সেখানকার নানান ষড়যন্ত্র আবিষ্কারের চেষ্টা করছি এবং অপরাধী;এর মুখপাত্রের মুখে তুলে দেওয়া ইস্যুগুলো নিয়ে বিব্রত হয়ে যাচ্ছি। আমরা প্রকৃতপক্ষে অপরাধীদের সুকৌশলে তৈরী ফাঁদে পা দিয়ে বিচারপ্রার্থীতের দোষারোপ করে মুলত আমরা অপরাধীদের দিকেই আমাদের অবস্থান নিচ্ছি। সেখানে আমাদের সরব উপস্থিতির ব্যর্থতার দোষটা আমাদেরই নিজেদের ঘাড়ে টেনে নেওয়া উচিত। 
 
খুব ভাল করে লক্ষ্য করবেন - হত্যা শাস্তি হত্যা ইসলামেরই বিধান – কিন্তু যারা সৌদি আরবে কিসাসের শাস্তির বিরুদ্ধে মানববন্ধন করে – তারাই কাদের মোল্লার ফাঁসী দাবীতে সমাবেশ করে – কিন্তু আমরা শুধু দুরে দাড়িয়ে অভিযোগ এই লোকগুলো নেতা হলো কেন? 
 
আমাদের জানা উচিত - নেতৃত্ব নেবার জন্যে সবচেয়ে প্রথম যা দরকার তা হলো ন্যয়ের পক্ষে দৃঢ় অবস্থান গ্রহন– আমরা যারা নিজেদের ইসলামের অনুসারী হিসাবে দাবী করছি – তারা বুকে হাত দিয়ে একবার বলার চেষ্টা করি – আমরা ৭১ এর গনহত্যার বিচারের বিষয়ে কতটুকু ন্যায় ভিত্তিক অবস্থান নিতে পেরেছি!  মানুষের প্রানের দাবী হলো ১৯৭১ সালের গনহত্যা আর জুলুমের বিচার – বিগত চারদশক ধরে রাজনেতিক সুবিধাবাদ আর অন্ধকারের সমঝোতার ফলে বিচারের বিষয়টি ধামাচাপা দিতে যাচ্ছিলো একদল ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী – আজ সেই বিচারের দাবী প্রবল হয়ে উঠেছে এবং এই জন্যে কোন নেতার বা দলের কাছে যায়নি জনতা – জনতা কোন নেতার প্রয়োজন অনুভব করছে না – তারা চেয়েছিলো একটা আহ্বান। সবচেয়ে ভাল হতো যদি ইসলামের অনুসারীরা সেই আহ্বানটা দিতো – তাহলে আজ হয়তো দেখতাম ধর্মব্যবসায়ী – ধর্মকে ব্যবহার করে ক্ষমতালোভীয় রাজনীতির বিপরীতে ইসলামের পক্ষে একদল মানুষ দাড়িয়ে যেতো – যা হতো দীর্ঘদিনের উল্টো পথে হাটার থেকে সরে সঠিক পথে চলে আসার সুযোগ – কিন্তু আমাদের জন্যে আফসোসের সময় আরো দীর্ঘায়িত হলো – কারন ধর্ম আর অধর্মের মুল যুদ্ধটাকে আরও একবার বিভ্রান্ত করলেন আমাদের আলেমসমাজ। তাই আপাতত বিভক্ত উম্মা নিয়ে চলতে হবে বাংলাদেশের ইসলামের অনুসারীদের – একদল বিচারের জন্যে আন্দোলন চালাবে – অন্যদল ইসলামের নামে দুর থেকে ষড়যন্ত্র খোঁজ করবে আর অভিযোগ করে যাবে।
 
 
 
 
 

২ comments

  1. 1

    কনিকা ফারজানা

    Agreed 100%! We are always resorting to reactionary approach due to lack of Islamic knowledge both as individuals and  scholars. We are in dire need of rightly guided scholars who can guide leaders and general people alike during trying times. Renowned scholar Sheikh Hamza Yusuf had spoken on muslim reaction to a similar incident of  “thaba baba” and I think we can learn a lot from this talk (1). We all need to calm down to avoid traps of hate preachers on both extremes who only know how to use religion for their hidden agenda. I personally reject those who are filled with hatred and rage towards others’ beliefs and views and failed to show respect on others right to choose. At the same time I condemn this new fashion of just humiliating and hurting 1.8 Billion people’s sacred belief in the name of freedom of speech (2). The moderate and truthful people from all community should be united against hateful hypocrites and keep their focus on real issues!
    (1)-
    (2)-

  2. 2

    আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন

    অনেক ধন্যবাদ। আপনার কমেন্ট অনেক বড় একটা বিষয়কে সহজ করে দিয়েছে। 
    শাহবাগে আন্দোলন শুরু হওয়ার ১৫ দিন পর আমাদের আলেমরা রাস্তায় নেমেছেন ব্লগারদের ফাঁসীর দাবীতে। এইটাই হলো বাংলাদেশের ইসলামের অবস্থা। যাদের নেতৃত্ব নেবার কথা -- যাদের কাছে আছে কোরআন আর রসুল (সঃ) সুন্নাহ -- তারা অপেক্ষা করলো ১৫দিন সেখানে ইসলামের বিরুদ্ধে কিছু হয় কিনা দেখার জন্যে। অবশেষে রাজাকাররা তাদের ধরিয়ে দিলো একটা ইস্যু -- যে লোকটা খুন হয়েছে সে ছিলো একজন নাস্তিক -- তার আসল নাম রাজীব -- তার জানাজা পড়ানো হয়েছে -- সুতরাং বাংলাদেশের উপর আসমান ভেংগে পড়ে গেছে। সুতরাং ব্লগাদের ফাঁসী চাই। 
     
    আমাদের আলেম সমাজের এই রিয়েকটিভ ভুমিকা নতুন নয়। হয় উনারা দ্বিধানিত্ব নতুবা উদাসীন। হঠাৎ কেউ ঝাঁকি দিয়ে ঘুম ভাংগালের হৈ চৈ করে উঠেন। 
     
    খুবই দু:খজনক -- যারা সমাজের নেতা হওয়ার কথা -- তারা হয়েছেন অনুসারী। 

Leave a Reply

Your email address will not be published.