«

»

Aug ১৯

ঈদের শুভেচ্ছা ও মধুরের সন্দেশ

প্রথমে সদালাপের সকল ভাই বোন: লেখক, পাঠক -সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা ও মধুরের সন্দেশ জ্ঞাপন করি। আশা করি সবাই ভাল এবং ঈদের খুশিতে বিভোর। কেউ হয়ত সন্দেশ খাচ্ছেন, কেউবা খাবেন খাবেন ভাবছেন। কেউবা হয়ত আধুনা দিনের খাবার ও পানীয় নিয়ে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিচ্ছেন।

    আজকে [১৯/০৮/১২] আমরা সবাই ব্রিটেনে ঈদ করলাম। চতুর্দিকে এখনো আনন্দঘন পরিবেশ। তবে অতি সামান্য কিছু পাকিস্তানি ভাই-বোন এই আনন্দের মধ্যে ধর্তব্য নন -তারা আজকে ঈদ করতে পারেন নি। উপন্যাসে কোন ভিল্যান না থাকলে যেমন গল্প সাজে না, তেমনি সমাজেও ব্যতীক্রমধর্মী কিছু না থাকলে, বলার মতও কিছু থাকেনা। এরা থাকলেই বরং বৈচিত্রের মাত্রায় রসের সংযোগ হয়।

    যাক, নিজেদের কথা বলাই ভাল। সকাল বেলায় কাপড়-চোপড় পরে কিছু খেতে হল। যদিও খাবারের কোন ইচ্ছে ছিল না, কিন্তু রোজার ঈদ বলে কথা। খেলামটা কী? বলেই ফেলি। খেলাম মধুরের সন্দেশ। সেই অতীতের কায়দায় বানানো। সিলেটী পুরানো ঐহিহ্য বলতে পারেন। আজকাল দেশে তারা এগুলো খায় কীনা জানি না, কেননা প্রায় ৩০ বছর হল দেশে ঈদ করি নি। থাক এটাও। তারপর, প্রায়ই যা হয়, ঘর থেকে বের হতে কিছু দেরি হল। তাই দ্বিতীয় জামাতে, আমার দুটো ছেলেকে নিয়ে, নামাজ আদায় করলাম। তবে গত রাতের সন্ধ্যা থেকে ফোনে টেক্স আসছে: শুভেচ্ছা আর শুভেচ্ছা -ঈদের শুভেচ্ছা। আমিও আঙ্গুল টিপতে টিপতে অনেক শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেছি। 

    নামাজ শেষে বাসায় ফিরার পথে কয়েকজন আত্মীয়ের বাসায় উঠলাম। সালাম শুভেচ্ছার পর সন্দেশ । আমি জানি আজকে সন্দেশের অত্যাচার সহ্য করতে হবে। তাই বলি, উপায় নাই গোলাম আলী!

সন্দেশ-পর্ব শেষে বাসায় ফিরলাম। টিভি অন করতেই দেখি ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী, অন্যান্য বড় বড় মন্ত্রী, এমপি, বিভিন্ন দেশের হাই কমিশনার, বড় বড় লেখক, স্বনামধন্য ব্যক্তিবর্গ  এবং আরও অনেকে ঈদের শুভেচ্ছা দিচ্ছেন। এতে জাতীয় এক বৈচিত্র মর্যাদার ভাব ফোটে ওঠলো। অন্তত আমার মনে।

    শুভেচ্ছা ও সৌহার্দের বিষয়টি আরেকটু লম্বা করা যায় বটে, তবে বাদ দিলাম। এগুলোতে সমাজবদ্ধ জীবনের বাস্তবতা ও প্রতীকী চিত্র ফোঁটে ওঠে। এই বাস্তবতা বিচ্ছিন্নবাদী ঈদে ফোঁটে ওঠে না। কল্পনাও করা যায় না। আমি যদি আজ ঈদ করি, আর আমার পাশের ঘরের ঈদ হয় আগামী কাল, অথবা ইংল্যান্ডের এক শহরে আজ, অন্য শহরে কাল হয়, তবে এখানে যে কেবল বিচ্ছিন্নতার চিত্র ফোঁটে ওঠে তাই নয়, বরং এটা তাওহীদী ধর্মের প্রধান একটি রূপকে ম্লানও করে। একই এলাকার অন্যান্য মানব গোষ্ঠীর কাছে একটি নেতিবাচক দৃশ্য প্রকাশ পায়। দেশের প্রধানমন্ত্রীও তার আপন দেশের নাগরিকদের ঈদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করতে সমস্যার সৃষ্টি করে। বিচ্ছিন্নতা আরও অনেক সমস্যার সৃষ্টি করতে পারে। ইউরোপ আমেরিকার মুসলিম নাগরিকগণ তা পরতে পরতে অনুভব করেন।

    অথোরিটি ও সামাজিক শৃঙ্খলা

    আমাদের ধর্মের প্রধান দুটি সোর্সের একটি হল কোরান আর অপরটি হাদিস। এই দুই সোর্সের তথ্য ও তত্ত্ব নিছক ভাষিক অর্থে (in literal meaning)  না দেখে, ভাষার পিছনের  নির্গূঢ় বিষয়গুলোও দেখা হয়ে থাকে। সেকালের খিলাফতি রাষ্ট্রীয় অথোরিটি দ্বীন ও দুনিয়ার বিষয় সমন্বিত করত। এতে ব্যক্তি ও সমাজ জীবন সামঞ্জস্যশীল হত। এসব আজ আমাদের অনেকের কাছে অনবিদিত। এমন অথোরিটির যে ভগ্নাংশটুকু উসমানী খেলাফতিতে বিরাজিত ছিল তা প্রথম মহাযুদ্ধের পর হারিয়ে যায়।  অথোরিটি ব্যতীত বিচ্ছিন্নতাকে নিয়ন্ত্রণ করার কিছু থাকে না। কোরান-হাদিসের ব্যাখ্যা ও প্রায়োগিক বিষয় বিচ্ছিন্নতায় পর্যবশিত হয়। আমরা এই বাস্তবতায় আছি। এখন প্রত্যেক দল ‘হামছে বড়া কৌন হ্যে’ অবস্থান থেকে বের হয়ে সামাজিকভাবে কিছু কিছু বিষয়ে ঐক্যের স্থান পেতে হবে। 

    তবে একটা জিনিস লক্ষণীয় যে ইসলামী পূণর্জাগরণ ও ঐক্যের আহবান সেক্যুলার শিক্ষাপীঠ থেকে আসা মুসলিমদের কাছ থেকেই বেশি আসছে। তাদের চিন্তায় ফ্রেস বিবেচনা কাজ করছে। তাদের যৌক্তিক এনালিসিস, দূরদর্শীতা, বলিষ্ঠ ব্যাখ্যাভঙ্গি ইত্যাদি নব দিগন্তের উন্মোচন করছে। এই সাথে সংযুক্ত হচ্ছে ইসলামে নবদীক্ষিত উচ্চ-শিক্ষিত এক শ্রেণীর ইউরোপিয়ান আমেরিকানরা। একদিন আন্দালুসিয়া যেভাবে অনন্য সাধারণ অনেক মুসলিম সুপণ্ডিতের জন্ম দিয়েছিল –এটাই মনে হয় এখন হতে যাচ্ছে। চাঁদ হয়ত বেশি দূরে নয়।

ঈদ নিয়ে বিচ্ছিন্নতা করলে যে অসুন্দরের রূপ তৈরি হয় তা বাচ্চাদের চোখেও অসুন্দর লাগে। তারাও প্রশ্ন করে। ছোট ছোট বাচ্ছাগুলোও বিচ্ছিন্ন পছন্দ করেনা।

    ঈদের নামাজ মুলত মাঠে পড়ার নিয়ম, মসজিদে মসজিদে নয়। এর কারণ সামাজিকতা, ঐক্য। অনেক ভিন্নতার পরেও ঐ মাঠে গিয়ে গলাগলি করাতে ঐক্য প্রকাশ পায়। আমরা নামাজ পড়তে যে পথ দিয়ে যাই, ফিরার পথে অন্য পথ ধরে আসি। এটাও সুন্নত। কেন? কারণ এক পথে যেতে গিয়ে কিছু লোকের দেখা সাক্ষাত হবে এবং অন্য পথে ফিরতে গিয়ে অন্য গ্রুপের সাথে দেখা হবে, কোশল বিনিময় করা হবে। নবীর (সা) বাণীতে আমাদের সমাজের উপমা এক দেহের সাথে।

    বেশ কিছুক্ষণ ধরে লিখছি। তিনটা সন্দেশ পড়ে থাকতে থাকতে ঠাণ্ডা হয়ে গিয়েছে। প্রথম চায়ের কাপ শেষ করেছি। গৃহিণী এবারে দ্বিতীয় কাপ দিয়ে দলবল নিয়ে আত্মীয়ের ঘরে বেরিয়ে পড়েছেন। আজকে সবার আনন্দ ঐক্যের সাগরে বিলীন হোক। একত্ববাদী ধর্মের একাত্বতা অনুভূতিতে স্পর্শ হোক। আমেরিকা ও কানাডাতেও তা হোক –এই দোয়া করি।

ঈদ মোবারক ও মধুরের সন্দেশ

_________________

দ্রষ্টব্যঃ এখানের অনেক কথা পাঁচমিশালি সন্দেশের মত। চেষ্টা করেছি ইজমালিভাবে কথা বলতে। কিন্তু মনের অনেক কথা মনের দিগন্তে একভাবে উদিত হয়, তাকে বাক্যে ও ভাষায় বন্দি করার পর ভাষিক রূপ অনেক সময় কিছুটা ভিন্ন হয়ে পড়ে। কোনো বাক্য যদি এখানে যারা এই ক'দিন ধরে লিখে ও মন্তব্য করে যাচ্ছেন (কোন কথা যদি কোনো উপায়ে) তাদের বিপক্ষে চলে যায়, তবে মনে রাখবেন যে আমি বিষয়টি যেভাবে দেখছি কেবল সেই তুলে ধরতে চেয়েছি, অন্য কোন উদ্দেশ্য নেই। আমার কথা শুদ্ধ এমন কোন দাবি এখানে নেই। আমার দেখা আমার চশমার রঙেই এসেছে।

১০ comments

Skip to comment form

  1. 1

    এম_আহমদ

    এই লেখাটি রবিবার ঈদের দিনে লেখি, কিন্তু পোস্টিং দেয়ার পর পরই সরিয়ে নেই। খেয়ালে একথাও ছিল যে বিষয়টি নিয়ে ঢের আলোচনা হয়ে গেছে কিন্তু আজ সদালাপে ঢুকে ভাবছি লেখাটি বরং এসেই যাক -এতে অনেক সামাজিক কথা বার্তা আছে, কিছু ঐতিহাসিকতার ছোঁয়াচও আছে।

  2. 2

    ফুয়াদ দীনহীন

    আমেরিকানরাও এইবার একসাথেই ঈদ করেছে। তাই ঈদ মোবারক ও মধুরের সন্দেশ ।
    ঐক্য দরকার, ঐক্যমত হতে হয়। দেখেন কি হয় আস্তে আস্তে 🙂

    1. 2.1

      দেখা যাক আগামীতে কি হয়। এবারের ঈদ ৩০ দিন পুরো করে হয়েছিল। এখানেও একটা ফ্যাক্টর কাজ করছে। পাঠ ও মন্তব্যের অন্য ধন্যবাদ।

  3. 3
    মহিউদ্দিন

    আপনার লিখাটা পড়ে খুবই ভাল লাগল। এখানে অত্যন্ত জরুরি কিছু বিষয়ে আপনি অলোকপাত করেছেন যা প্রশংসার দাবী রাখে। আসলেই কোন সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে কোরআন হাদিসে প্রদত্ত নির্দেশকে বুঝতে হলে নিছক আক্ষরিক অর্থের (literal meaning)  ধরে হুট করে সিদ্ধান্ত নেয়া সঠিক হয়না। বৃহত্তর পরিসরে বিবেচনা তথা “বিগার পিকচারকে” সামনে রাখতে হয়। তবে মুসলিম বিশ্বে কোন সেন্ট্রাল অথরিটি তথা ইসলামী রাজনৈতিক ব্যবস্থা না থাকায়ই আজ এত সমস্যা। আর এ ব্যবস্থা যারা ভেঙ্গে চুরমার করে দিয়েছে তারা এ ব্যবস্থা যাতে পুন:রুদ্ধর না হতে পারে সে ব্যবস্থাও করেছে অতি কৌশলে। শত শত বছরের কুসংস্কার ও কায়েমি স্বার্থ-বাদীদের দৌরাত্ম্য যে অশুভ চক্র ও বস্তুতান্ত্রিক মন মানষিকতা গড়ে উঠেছে মুসলিম সমাজে তা থেকে সহজে উদ্ধার সম্ভব নয়। বিশেষ করে ইসলামের নামে যারা গতানুগতিক কর্মপদ্ধতিতে অভ্যস্ত তাদের পক্ষে তো সম্ভবই নয়! কেননা যারা একই কাজ একই পদ্ধতিতে করে বার বার ব্যর্থ হওয়া স্বত্বেও  যদি আশা করে ভিন্ন রেজাল্ট তার চেয়ে বোকা  আর কে হতে পারে?
    এ কথা সত্যি যে ইউরোপ আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদী চক্র মুসলিম সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক স্বাধীনতার  মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছিল সেই ইউরোপ আমেরিকার সমাজ থেকেই মুসলিমরা এখন ইসলামের পুনঃ:জাগরণে বুদ্ধি-ভিত্তিক ইতিবাচক চিন্তা ভাবনা ও প্রচেষ্টা শুরু করেছে যা ইনশাল্লাহ একসময় এখান থেকেই মুসলিম বিশ্বে পৌছাতে সক্ষম হবে।

    1. 3.1
      এম_আহমদ

      পাঠ ও মন্তব্যের জন্য মধুরের সন্দেশ জ্ঞাপন করি। কুল্লু আমিন ওয়া আনতুম বি খাইর।

  4. 4
    এম_আহমদ

    সদালাপের সকল ভাই বোন: লেখক, পাঠক -সবাইকে ঈদের শুভেচ্ছা ও মধুরের সন্দেশ জ্ঞাপন করি।

    1. 4.1
      পাভেল আহমেদ

      ঈদ মুবারক আহমদ ভাই! 🙂

      সন্দেশ খাইতে চাই! 😛
       

      1. 4.1.1
        এম_আহমদ

        @পাভেল আহমেদ:

        পাভেল ভাই, আপনাকে ও আপনার পরিবারের সবাইকে ঈদ মোবারক। আপনাকে পেলে জনমের মত সন্দেশ খাইয়ে দিতাম। কিন্তু পাই কই। আজ শ্বশুর বাড়ী এসেছি। কী আর বলি, এই তো, কেবল এই সন্দেশের অত্যাচার, চলছেই।  

  5. 5
    মোঃ তাজুল ইসলাম

    বড় ভাই, আসসালামু আলাইকুম। সন্দেশ খাইছেন ২০১২ সালে। আজকের ঈদে কি খাইলেন? 

    ঈদের শুভেচ্ছা। মাত্র ইতিকাফ শেষ করে বিদায় নিয়ে মসজিদ থেকে বাসায় এলাম। আগামীকাল আমাদের ঈদ। সদালপের সকল ভাইবোনদের জন্য দোয়া। সবার জীবন শান্তিময় হোক।

    1. 5.1
      এম_আহমদ

      তাজুল ভাই সালাম ও ঈদ মোবারক।

      কী খেলাম? সেই ৫ বছর আগে যা খেয়েছি -একদম তা।  ১০ বছর আগেও ছিল তা। ২০ বছর আগেও। আবার বলতে পারেন ৩০ বছর আগেও। তেমনি ৪০ বছর আগে। না বরং বলুন, জন্মের পর থেকে যা খেয়ে আসছি তাই।  কোন পরিবর্তন নেই। বিষয়টা নামাজে সূরাহ ফাতেহার মত।

      ঈদ মোবারাক।

Leave a Reply

Your email address will not be published.