«

»

Sep ০১

বৃহঃবারের অপেক্ষা !

 

 

fb11

বাস বদল করে লেগুনায় উঠলাম। সাথে আমার ইছামতি কলেজের অধ্যক্ষ মহোদয়সহ অন্যান্য সহকর্মীবৃন্দ। ছাতা থাকা সত্ত্বেও আমরা কেউ-ই এলোপাথারি বৃষ্টির ছোবল থেকে রেহাই পাইনি। অনেকটাই কাকভেজা হয়ে জড়োসড়ো হওয়ার মতো অবস্থা! হঠাৎ আমার চোখ পড়ল লেগুনায় কর্মরত ফুটফুটে এক শিশু কন্ট্রাকটারের ওপর। বয়স ছয় কী সাত হবে! সমস্ত চোখ-মুখ জুড়ে কী যে অপূর্ব মায়া সচক্ষে না দেখলে বিশ্বাসই করাই দায়! এই অল্প বয়সে যখন তার সমবয়সী বন্ধুদের সাথে স্কুলে থাকার কথা, খেলাধুলা করার কথা কিংবা হাতে থাকার কথা রঙিন বই আর কলম- আজ সেখানে কিনা সে লেগুনা যাত্রীদের ভাড়া তুলছে! আমার কৌতূহলের মাত্রা বাড়তে থাকে।

 

আমি জিজ্ঞেস করি- কী নাম তোমার?- জসীম উদ্দীন! আমি সরস কৌতুক করে বললাম- বাহ্! পল্লি কবি জসীমউদদীন! ছেলেটি আমার সরস কৌতুক না বুঝে আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। আমি আবারো তাকে জিজ্ঞেস করলাম- বাবার নাম কিতা? - নজরুল ইসলাম। আমি একটু মুচকি হেসে বললাম- ওমা! তুমি তো দেখা যার কবি বংশের লোক!

 

বোধ করি ছেলেটি তখনো কবি বংশের মর্মার্থ উদ্ধার করতে না পেরে আবারও বোকাবোকা ভাব নিয়ে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি পুনরায় জিজ্ঞেস করলাম- বাড়ি কিয়ানো? সে ক্ষীণস্বরে বলল- নালুয়াটি। স্কুলে যাও?- সে তখন দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে! তার দীর্ঘশ্বাসে বাতাস ভারী হতে থাকে, আকাশের মেঘ আরো ঘন থেকে ঘনতর হতে থাকে। আমার মনটা মোচর দিয়ে ওঠে। আমি বলললাম- যদি তোমারে স্কুলে যাওয়ার সুযোগ খরিয়া দেই তুমি যাইবায় নি? সে আমার দিকে কিছুক্ষণ নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে কী যেন ভাবলো। তারপর একটু হাসির ঝিলিক মেখে বললো-জ্বী অয়। আমার সহকর্মীদের দৃষ্টিও তখন তার দিকে। আমার মনে পড়ে গেল সাম্প্রতিক রাজন হত্যার পর দেশে প্রণিত নতুন আইনের কথা। ১০ বছরের নিচে কোন শিশুকে কোন প্রতিষ্ঠানে শ্রমিক হিসেবে  রাখা যাবে না! রাখলে দণ্ডনীয় অপরাধ হিসেবে তা গণ্য হবে।

 

একবার ভাবলাম ড্রাইভারকেই জবাবদিহির আওতায় আনি। আবার ভাবলাম নাহ্! থাক। ওসব পুলিশি ঝামেলায় গিয়ে লাভ কী! তার চেয়ে মনে মনে ভিন্ন একটি কৌশল অবলম্বন করলাম। আমি জসীমকে বললাম- তুমি ছোট্ট এখটা খাম খরতা ফারবায় নি?- খিতা? আগামী বিশুদবার (বৃহঃপতিবার) তোমার আব্বারে নিয়া কলেজে আইতায় ফারবায়নি? কথাটি শোনার পর থেকে তাকে খানিকটা চিন্তিত মনে হল। আমি আবারও কৌশল অবলম্বন করলাম। বললাম- তোমার আব্বারে খইবায় কলেজের ছার অখল তানরে চা খাওয়ার দাওয়াত দিছইন। ফারবায় নি?- এবার সে বেশ নির্ভরতার হাসি দিয়ে বলল- জ্বি অয় ফারমু। কথা শেষ না হতেই লেগুনা এসে থামলো কলেজ গেইটে। ভাড়া মিটিয়ে আমরাও নেমে গেলাম।

 

কেন যেন তখনও আমার ভেতরে কোন প্রকার নির্ভরতা খুঁজে পেলাম না। আমি এগিয়ে ড্রাইভারের কাছে যাই। মুচকি হেসে বলি- ভাইসাব, ছোট্ট এখটা উফখার করবা নি?- জ্বি অয় ছার, খউক্কা।– জসীমের বাফরে এখটু কইবা- আগামী বৃহঃবার তান বাচ্চারে (জসীম কে) নিয়া যেন আমরার কলেজে আইন, চা খাবার দাওয়াত। ফারবা নি ভাই?- ড্রাইভার মুচকি হেসে বলে- জ্বি অয় ছার। চিন্তা খরবা না, আমি খইমুনে যাওয়ার লাগি।

 

ফেরার সময় আমি আবারও জসীমের দিকে তাকাই। তার চোখে-মুখে তখনও কিছুটা সংশয়, কিছুটা উৎকণ্ঠা, কিছুটা হাসির ঝিলিকের আভা! ড্রাইভারের নির্ভরতা শর্তের পরও কেন যেন শিশুটিকে ছেড়ে যেতে মন চাচ্ছিল না। তবুও চলে আসতে হল, চলে আসতে হয় বলে। ভেতরে এখন কেবলি বৃহঃবারের অপেক্ষা!

 

———————

মুনশি আলিম

০১.০৯.২০১৫

জকিগঞ্জ, সিলেট

 

 

 

 

২ comments

  1. 1

    জারাহ জেবিন

    আমরাও আছি বৃহস্পতিবারের অপেক্ষায়। দয়া করে জানাবেন কি হলো!!!!!

    1. 1.1

      মুনশি আলিম

      কেউ কথা রাখেনি, কেউ কথা রাখে না।

       

      তাকে নিয়ে আজ নতুন পোস্ট দিয়েছি।

Leave a Reply

Your email address will not be published.