একটি উপমা ও ইমাম গাজ্জালী (রঃ)
এক বাদশাহ তার কর্মচারীকে খেজুর সংগ্রহ করার জন্য নির্দেশ দিল। বাদশাহর অনেকগুলো বাগান আছে। পরপর বাগানগুলো অবস্হিত। এক বাগানের মধ্য দিয়ে অন্য বাগানে যেতে হয়। কিন্তু নিয়ম হোলো, কোনো বাগানে প্রবেশের পর আগের বাগানে যাওয়া যায় না।
কর্মচারীটি ১ম বাগানে প্রবেশ করল এবং বাগানের সৌন্দর্যে অভিভূত হয়ে গেলো। কিছু খেজুর সংগ্রহ করার পর দ্বিতীয় বাগানে গেলো, এবং দেখলো যে আগের বাগানের চেয়ে এই বাগানের খেজুর আরো উত্তম। তাই সে পূর্বের খেজুরগুলো ফেলে দিলো এবং চিন্তা করলে সামনের বাগানের খেজুর হয়ত এর চেয়েও উত্তম হবে। এইভাবে সে বাগানের অন্যান্য সৌন্দর্যে বিভোর হয়ে গেলো এবং একটার পর একটা বাগান অতিক্রম করতে লাগলো।
হঠাৎ একটি বাগানে প্রবেশ করে দেখলো সেখানে কোনো খেজুর নেই। আরো আফসোসের কথা হোলো এরপর কোনো বাগানও নেই। এবং পূর্বের বাগানেও প্রবেশ করা যাবে না। সে আফসোস করতে লাগলো এবং বাদশাহর জন্য কোনো খেজুর সংগ্রহ করতে পারলো না। তার বার বার মনে হতে লাগলো কেনো সে আগেই খেজুর সংগ্রহ করে রাখেনি।
প্রতিটি বাগান হোলো একটি দিন। খেজুর হোলো তার আমল। শেষ বাগানটি হোলো তার জীবনের শেষ দিন। এভাবে আশা'য় আশা'য় আমাদের দিন গুলো শেষ হয়ে যায়। প্রতি মুহুর্তে আমরা চিন্তা করি আগামীকাল ইবাদত করবে। এমনভাবে আমাদের মৃত্যুর সময় এসে যায়।
হজরত ইমাম গাজ্জালী (রঃ) আমলের গুরুত্ব বুঝানোর জন্য উপরের উপমাটি কোনো এক বইয়ে উল্লেখ করেছেন। আমাদের কাছে আজ আমলের গুরুত্ত্ব কমে গেছে। ক্লাশে ফার্স্ট হবার জন্য আমরা সর্বাত্নক চেষ্টা করি, পরীক্ষার আগের দিন সারা রাত পড়াশোনা করি কিন্তু আমল করবার সময় মনে হয় আগামীকাল করব।
রবী ইবনে খাইসাম (রঃ):
রবি ইবনে খাইসাম (রঃ) আপন গৃহে একটি কবর খনন করেছিলেন। তিনি যখনি অন্তরে কঠোরতা অনুভব করতেন তখন কবরে ঢুকে অনেক্ষন শুয়ে থাকতেন। এরপর এই আয়াত তেলাওয়াত করতেন
حَتَّى إِذَا جَاء أَحَدَهُمُ الْمَوْتُ قَالَ رَبِّ ارْجِعُونِ
যখন তাদের কারও কাছে মৃত্যু আসে, তখন সে বলেঃ হে আমার পালণকর্তা! আমাকে পুনরায় (দুনিয়াতে ) প্রেরণ করুন।
لَعَلِّي أَعْمَلُ صَالِحًا فِيمَا تَرَكْتُ كَلَّا إِنَّهَا كَلِمَةٌ هُوَ قَائِلُهَا وَمِن وَرَائِهِم بَرْزَخٌ إِلَى يَوْمِ يُبْعَثُونَ
যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি, যা আমি করিনি। কখনই নয়, এ তো তার একটি কথার কথা মাত্র। তাদের সামনে পর্দা আছে পুনরুত্থান দিবস পর্যন্ত। (মুমিনুন ৯৯-১০০)
এ আয়াতটি কয়েকবার তেলাওয়াত করতেন। তারপর নিজেকে সম্বোধন করে বলতেন "হে রবি এখন তোমাকে তো ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। এখন আমল করো।
হযরত হাতেম আসেম (র:):
হযরত হাতেম আসেম (র:) বলতেন আমি খেয়াল করে দেখলাম মানুষ বিভিন্ন জিনিস দুনিয়াতে ভালোবাসে এবং সেটা যত্নের সাথে সংরক্ষন করে। কিন্তু মানুষ যেটা ভালোবাসে সেটা কবরে নিয়ে যেতে পারে না , একমাত্র কবরে সে নিয়ে যেতে পারে "উত্তম আমলে" যেটা এই আয়াতে বলা হয়েছে
إِنَّ الَّذِينَ آمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُوْلَئِكَ هُمْ خَيْرُ الْبَرِيَّةِ
যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তারাই সৃষ্টির সেরা।
جَزَاؤُهُمْ عِندَ رَبِّهِمْ جَنَّاتُ عَدْنٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا رَّضِيَ اللَّهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ذَلِكَ لِمَنْ خَشِيَ رَبَّهُ
তাদের পালনকর্তার কাছে রয়েছে তাদের প্রতিদান চিরকাল বসবাসের জান্নাত, যার তলদেশে নির্ঝরিণী প্রবাহিত। তারা সেখানে থাকবে অনন্তকাল। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারা আল্লাহর প্রতি সন্তুষ্ট। এটা তার জন্যে, যে তার পালনকর্তাকে ভয় কর। (সুরাহ আল বাইয়্যিনাত : ৭,৮)
হযরত শিবলী (রহ:) ও একটি সুন্নত:
হযরত শিবলী (রহ:) একজন পরহেযগার বেক্তি ছিলেন। মৃত্যুর কাছাকাছি সময়ে সে অনেক কষ্টে ওযু করলেন। তারপর তার ছাত্রদের বললেন আমাকে আবার ওযু করাও কেননা একটি সুন্নত ছুটে গেছে। দাড়ি খিলাল করা হয়নি। ছাত্ররা বললো "আপনি এখন মৃত্যু পথযাত্রী , এই মুহূর্তে একটি সুন্নত বাদ যাক , অসুবিধা কি ?
তিনি বললেন একটু পরই আমার মৃত্যু হবে। একটি সুন্নত যদি আমি বাদ দেই এই অবস্থায় রসূলকে মুখ দেখাবো কিভাবে?
একটি ধোকা :
অনেক সময় এলেম অর্জন করতে যেয়ে আমলের কথা খেয়াল থাকে না । দেখা যায় এলেম অর্জন করছে, কিন্তু গোনাহ থেকে বেচে থাকতে পারছে না । ইমাম গাজ্জালী (রহ:) বলেছেন "যে এলেম তোমাকে দুনিয়ার গোনাহ থেকে বেচে থাকতে দেয় না, সেই এলেম কিভাবে তোমাকে কিয়ামতের দিন দোযোখের আগুন থেকে রক্ষা করবে?" এইজন্য উনি অনত্র বলেছেন "এলেমহীন আমল মুর্খতা, আমলহীন এলেম প্রতারণা। যাদের এলেম আছে কিন্ত আমল করে না তাদের উদাহরণ হোলো; কারো রোগ হবার কারণে ডাক্তারের কাছে গেলো, রোগ ধরা পরলো এবং ডাক্তার ওৌষধ লিখে দিলেন। সে ঔষধও কিনলো কিন্তু খেলো না। আশা করলো ডাক্তারের কাছে যাবার কারণে তার ওসুখ সেরে যাবে।
উপসংহার
উপরের ঘটনাগুলো বিশ্লেষণ করলে আমরা বুঝতে পারবো আগকার উলামায়ে কিরামগণ, আল্লাহওয়ালা গণ কিভাবে আমল করতেন। হযরত জারজানী (রহ:)-কে কেউ দেখলেন রুটি পানি দিয়ে ভিজিয়ে খাচ্ছেন। এর কারণ জিজ্গেস করলে উনি বললেন " রুটি পানি দিয়ে ভিজিয়ে খেলে সময় কম লাগে এবং এই সময়ের মধ্যে আমি হিসেব করে দেখেছি ৭০ বার সোবহানাল্লাহ বেশী পড়া যায়। তাই রুটি পানি দিয়ে ভিজিয়ে খাচ্ছি।"
বর্তমানে Time Management বলে একটি টার্ম আছে। কিভাবে সময়কে সুষ্ঠুভাবে কাজে লাগানো যায়। গবেষণা করছে অমুসলিমরাই বেশী। আপনি যদি রেন্ট-এ-কার থেকে ১ দিনের জন্য একটি গাড়ী ধার নেন এবং ফেরত দেবার সময় একটি সাইকেল ফেরত দেন, সেটা কি যৌক্তিক হবে? কিংবা গাড়ির একটি দরজা ভেংগে ফেরত দিলেন, সেটাও তো গ্রহণযোগ্য হবে না। কেননা যে গাড়ি ধার নিয়েছেন সেটা হচ্ছে আমানত এবং ঠিক শর্ত মতো সেটা ফেরত না দিলে সেটা হবে খেয়ানত। ঠিক তেমনি আল্লাহ পাক আমাদের যে জিনিসগুলো দিয়েছেন সেগুলো আমাদের নিকট আমানত। সময় তেমনিই একটি আমানত। এই আমানত সঠিকভাবে যদি আমরা ব্যবহার না করি তাহলে সেটা হবে খেয়ানত। এই আমানত সঠিকভাবে যদি আমরা ব্যবহার না করি তাহলে সেটা হবে খেয়ানত। তাই আমরা যদি প্রকৃত Time Management না করি, সময়কে কাজে লাগিয়ে আমল না করি, তাহলে সেটা হবে খিয়ানত এবং কিয়ামতের দিন সেটার হিসাব পরিপূর্ণভাবে আল্লাহ তাআলার নিকট বুঝিয়ে দিতে হবে। আল্লাহ-পাক আমাদের সঠিকভাবে এবং সময়মতো আমল করার তৌফিক দান করুন। আমিন।

shahriar
মার্চ ৮, ২০১৭ at ১০:৪৪ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
আপনার সুন্দর লেখার জন্য ধন্যবাদ…
jajak-allah khairan.
হাফিজ
মার্চ ৮, ২০১৭ at ১১:০৭ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
আপনাকেও ধন্যবাদ
আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন
মার্চ ৮, ২০১৭ at ৭:২১ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
ভাল লাগলো -- বিশেষ করে সময়ের বিষয়গুলো। তবে যে কাহিনীগুলো বলেছেন -- তার সূত্র উল্লেখ করলে ভাল হতো। ধন্যবাদ।
মার্চ ৮, ২০১৭ at ৮:৩৭ অপরাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
@আবু সাঈদ জিয়াউদ্দিন:
@জিয়া ভাই ঠিকই বলেছেন , সূত্র দেয়া উচিত ছিল , খেয়াল করিনি।
রবী ইবনে খাইসাম (রঃ) এর ঘটনা -- বই সিরাতুল আউলিয়া- লেখক -- এমাম আব্দুল ওয়াহাব সারেনি (রহঃ)
হযরত হাতেম আসেম (র:) এর ঘটনা -- বই আল মুনকেজু মীনাদদালাল -- লেখক এমাম গাজ্জালী (রহঃ)
হযরত শিবলী (রহ:) ও একটি সুন্নত -- বই খুতবাতে জুলফিকার -- লেখক মাওলানা জুলফিকার আহমেদ নকশবন্দী (রহঃ)
হযরত জারজানী (রহ:) এর ঘটনা -- বই খুতবাতে জুলফিকার -- লেখক মাওলানা জুলফিকার আহমেদ নকশবন্দী (রহঃ)
মহিউদ্দিন
মার্চ ১০, ২০১৭ at ৯:২০ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
ফেইসবুক, টুইটার ব্লগিং ইত্যাদি সামাজিক মিডিয়ার অসতর্ক ও অতিরিক্ত ব্যবহার মানুষের মনকে দ্রুত দুষিত করে ফেলে এবং অত্যন্ত অধৈর্য্যশীল (impatience) তথা কেমন যেন এক অস্থির মনের প্রাণীতে রূপান্তরিত করে দেয় নিজের অজান্তে। তাই দেখা যায় অনেকের মনই আর ধৈর্য ধরে কিছু পড়তে চায়না এমন কি কেউ কোন ভাল প্রবন্ধ নিবন্ধের লিংক দিলেও সেটা পড়তে চায়না। মন ব্যস্ত থাকে দ্রুত কিছু বলা যায় কিনা কিছু পড়া যায় কিনা কিংবা বিনোদন বা পরনিন্দা ও কেলেঙ্কারির কিছু পায় কি না । আর সে ধান্দায় সময় অপচয় করা। অন্য কথায় ডিজিটাল যুগের সামাজিক মিডিয়া একদিকে মানুষের মনকে দুষিত, অধৈর্য্যশীল করে এবং অন্য দিকে সময়ের অপচয় করে।
ইসলামী স্কলার ইবনে কাইয়িম আল-জাওজিয়া রাহিমাল্লাহু বলেন বিশ্বাসীর জন্য “সময়ের অপচয়” মৃত্যু থেকেও খারাপ! কারন মৃত্যু আপনাকে জীবন থেকে ছিন্ন করে আর সময়ের অপচয় আপনাকে ছিন্ন করে আল্লাহর সাথে সংযোগ।
হাফিজ
মার্চ ১৩, ২০১৭ at ৭:২১ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
সহমত
হাফিজ
মার্চ ১৩, ২০১৭ at ৭:২২ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
@মহিউদ্দিন: সহমত
হাফিজ
মার্চ ১৩, ২০১৭ at ৭:২৩ পূর্বাহ্ণ (UTC 6) Link to this comment
সদালাপে বেশ কিছু টেকনিক্যাল সমস্যা আছে। আপনার কমেন্টের রিপ্লাই দিতে যেয়ে অনেক কষ্টে পারলাম