«

»

Jun ০৩

“হে মুমিন গন, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে, ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে।”

(ধারা বাহিক অনুবাদ, পূর্ব প্রকাশিতের পর)
===================================
সুরা আল মাঈদা রুকু;-২ আয়াত;-৬-১১ কোরানের কথা-৯৪

আলোচ্য আয়াতে নামাজের পূর্ব প্রস্তুতী হিসাবে ওজু বা তায়াম্মুম সম্পর্কে বলা হয়েছে।

০৬/يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ إِذَا قُمْتُمْ إِلَى الصَّلاةِ فاغْسِلُواْ وُجُوهَكُمْ وَأَيْدِيَكُمْ إِلَى الْمَرَافِقِ وَامْسَحُواْ بِرُؤُوسِكُمْ وَأَرْجُلَكُمْ إِلَى الْكَعْبَينِ وَإِن كُنتُمْ جُنُبًا فَاطَّهَّرُواْ وَإِن كُنتُم مَّرْضَى أَوْ عَلَى سَفَرٍ أَوْ جَاء أَحَدٌ مَّنكُم مِّنَ الْغَائِطِ أَوْ لاَمَسْتُمُ النِّسَاء فَلَمْ تَجِدُواْ مَاء فَتَيَمَّمُواْ صَعِيدًا طَيِّبًا فَامْسَحُواْ بِوُجُوهِكُمْ وَأَيْدِيكُم مِّنْهُ مَا يُرِيدُ اللّهُ لِيَجْعَلَ عَلَيْكُم مِّنْ حَرَجٍ وَلَـكِن يُرِيدُ لِيُطَهَّرَكُمْ وَلِيُتِمَّ نِعْمَتَهُ عَلَيْكُمْ لَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ
অর্থাৎ;-হে ইমানদারগন, তোমরা যখন নামাজের জন্য দাঁড়াতে চাও, তখন তোমরা ধৌত করে নেবে নিজের মুখ মণ্ডল এবং হাত কনুই পর্যন্ত, আর মসেহ করে নেবে নিজের মস্তক, এবং ধৌত করে নেবে নিজের পা গ্রন্থি পর্যন্ত। কিন্তু যদি তোমরা অপবিত্র থাক, তবে উত্তম রূপে পবিত্র হবে। আর যদি তোমরা পীড়িত হও কিংবা সফরে থাক অথবা তোমাদের মধ্যে কেউ প্রস্রাব পায়খানা সেরে আসে কিংবা তোমরা স্ত্রী সহবাস কর অতঃপর পানি না পাও, তবে তোমরা পবিত্র মাটি দ্বারা তায়াম্মুম করবে, নিজেদের মুখ মণ্ডল ও হাত মসেহ করে নাও ঐ মাটি দিয়ে। আল্লাহ তোমাদেরকে পবিত্র রাখতে চান। এবং তোমাদের প্রতি স্বীয় নেয়ামত পূর্ণ করতে চান, যাতে তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।।
এ আয়াতে মুখ মণ্ডল ধৌত করা ও হাত কনুই পর্যন্ত ধৌত করতে বলা হয়েছে। তার পর মাথা মসেহ করতে বলা হয়েছে, কিন্তু কোন সীমান বলা হয়নি, পরক্ষনেই পায়ের কথা বলা হয়েছে,যার সীমানা গ্রন্থি। যেহেতু এটা মাথা মসেহের পরেই এসেছে, তাই অনেকের মতে পাও মসেহের মধ্যেই পড়ে, অর্থাৎ পা ও মসেহ করতে হবে। কিন্তু শব্দের বিন্নাস অনুযায়ী ও সীমানা উল্লেখের দরুন, অনেকের মতে তা আগের ক্রীয়া হাত ধৌত করার সাথেই এর সম্পর্ক, তাই মসেহ নয় ধৌত হবে। আরও একটি বিষয় লক্ষ্যনীয়, তাহল; “ফামসেহু”এর সাথে “রুউসেকুম” বলা হয়েছে, যদি পা মসেহ করা হত তবে “আরজুলাকুম”না হয়ে “আরজুলেকুম”হত।

তায়াম্মুম অর্থ ইচ্ছা করা। পানির অভাব বা পানি ব্যবহারে অসুবিধা থাকলে পবিত্র মাটি দ্বারা বিকল্প ওজুকে তায়াম্মুম বা হয়েছে। মুখমণ্ডল ও হাত মসেহের দ্বারা তা করা যায়।
আল্লাহ তায়ালা মানুষের পবিত্রতাই পছন্দ করেন।
০৭/وَاذْكُرُواْ نِعْمَةَ اللّهِ عَلَيْكُمْ وَمِيثَاقَهُ الَّذِي وَاثَقَكُم بِهِ إِذْ قُلْتُمْ سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ عَلِيمٌ بِذَاتِ الصُّدُورِ
অর্থাৎ;-তোমরা আল্লাহর নেয়ামতের কথা স্মরণ কর, যা তোমাদের প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। আর ঐ অঙ্গীকার যা তোমাদের কাছথেকে নিয়েছেন। যখন তোমরা বলেছিলে; আমরা শুনলাম ও মেনেনিলাম। আল্লাহকে ভয় কর, নিশ্চয়ই আল্লাহ অন্তরের বিষয় সম্পর্কে পুরোপুরি খবর রাখেন।
আল্লাহর দেওয়া অন্যান্ন নেয়ামতের সাথে পবিত্র কোরআন কেও এ আয়াতে নেয়ামত বলা হয়েছে। এখানে একটি ওয়াদার কথা বলা হয়েছে, যা আমরা সুরা বাক্বারার শেষে পড়ে এসেছি।“আমরা শুনলাম ও মেনে নিলাম” এই মেনে নেওয়াটাই ওয়াদা বা চুক্তি। এ কথাটিকেই ইহুদীরা অন্য শব্দ সহযোগে বলত,যার মানে হয়, আমরা শুনলাম ও অস্বীকার করলাম।
স্মরণ করা যেতে পারে এ সুরার প্রথম আয়াতেই ওয়াদা পূরণ করার ব্যাপারে বলা হয়েছে। যে সমস্ত ওয়াদা আমরা করেছি তা যথাযত পূরণ করতেই হবে। মনে রাখতে হবে সুরা ফাতেহার মাধ্যমেও আমরা প্রতি নিয়ত আল্লাহর সাথে ওয়াদাবদ্ধ হচ্ছি আবার পরক্ষনেই অজান্তে তা ভঙ্গ করে চলেছি।

০৮/ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ كُونُواْ قَوَّامِينَ لِلّهِ شُهَدَاء بِالْقِسْطِ وَلاَ يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَى أَلاَّ تَعْدِلُواْ اعْدِلُواْ هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَى وَاتَّقُواْ اللّهَ إِنَّ اللّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ
অর্থাৎ;-হে মুমিনগন, তোমরা আল্লাহর উদ্দেশ্যে, ন্যায় সাক্ষ্য দানের ব্যাপারে অবিচল থাকবে। এবং কোন সম্প্রদায়ের শত্রুতার কারণে কখনও ইনসাফ পরিত্যাগ করোনা। ইনসাফ করো এটাই খোদাভীরুতার অধিকতর নিকটবর্তী। আল্লাহকে ভয় কর! তোমরা যা কর, নিশ্চয় আল্লাহ সে বিষয়ে খুব জ্ঞাত।

আমরা সুরা নিসার ১৩৫ নং আয়াতে পড়ে এসেছি ঠিক এই কথাটিই। ওখানেও ন্যায় বিচার বা ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে বলা হয়েছে। ওখানে সতর্কতা ছিল, ইনসাফ প্রতিষ্ঠা যদি নিজের বা আত্মিয় পরিজনের বিপক্ষেও যায় তবুও যেন তা করা হয়। আর এখানে বলা হচচ্ছে যদি তা দুশমন সম্প্রদায়ের পক্ষে যায়, তবুও তার অন্যথা না হয়।
দুটি আয়াতে একটি সাধারণ বিষয় লক্ষনীয় যে, সুরা নিসায় ‘কিস্ত’ এর যায়গায় এখানে ‘লিল্লাহ’ শব্দটি এসেছে। দুটি আয়াতের আবেদন এক অভিন্ন। অতএব, আল্লাহ এবং ইনসাফ ও এক অভিন্ন।

ইনসাফ মানুষের স্বভাবজাত চাহিদা। যুগে যুগে মানুষ এই ইনসাফের সন্ধানে বিভিন্ন মতবাদের পিছনে দৌড়ে অযথা কাল ক্ষেপন করে চলেছে। অথচ মহান আল্লাহ মানুষের গাইড পবিত্র কোরআনের মাধ্যমে ইনসাফ প্রতিষ্ঠার সফল সন্ধান দিয়েছেন। তাই শুধু বাহ্যিক চাহিদাই নয়, আল্লার গোলাম বা ভৃত্য হওয়ার চাহিদা অনুযায়ীও আমাদের তা বাস্তবায়নে সচেষ্টই নয়, সর্বাত্মক প্রচেষ্টা থাকা জরুরী।

০৯/وَعَدَ اللّهُ الَّذِينَ آمَنُواْ وَعَمِلُواْ الصَّالِحَاتِ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ عَظِيمٌ
অর্থাৎ;-আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এ রূপ লোকদের যারা ইমান আনে ও নেক কাজ করে, তাদের জন্য রয়েছে ক্ষমা ও মহা পুরষ্কার।
১০/وَالَّذِينَ كَفَرُواْ وَكَذَّبُواْ بِآيَاتِنَا أُوْلَـئِكَ أَصْحَابُ الْجَحِيمِ
অর্থাৎ;-আর যারা কুফরী করে ও আমার আয়াতকে মিথ্যা মনে করে, তারা দোজখের অধিবাসী।

১১/يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُواْ اذْكُرُواْ نِعْمَتَ اللّهِ عَلَيْكُمْ إِذْ هَمَّ قَوْمٌ أَن يَبْسُطُواْ إِلَيْكُمْ أَيْدِيَهُمْ فَكَفَّ أَيْدِيَهُمْ عَنكُمْ وَاتَّقُواْ اللّهَ وَعَلَى اللّهِ فَلْيَتَوَكَّلِ الْمُؤْمِنُونَ
অর্থাৎ;-ওহে যারা ইমান এনেছো, তোমরা স্মরণ করো আল্লাহর নেয়ামতের কথা, যখন এক সম্প্রদায় সংকল্প করেছিল তোমাদের বিরুদ্ধে হাত বাড়াতে, তখন তিনি তাদের হাত তোমাদের প্রতিহত করেছিলেন। তোমরা ভয় কর আল্লাহ কে। আর আল্লাহর উপরেই মুমিনদের ভরষা করা উচিৎ।
আহজাবের যুদ্ধের পর একটি কওম গোপনে মুসলীমদের বিরুদ্ধে মুশরিকদের উদ্ভুদ্ধ করতে থাকে। আর হুদায়বিয়ার সন্ধীর প্রাক্কালে মুশরিকগন মুমিনদের মক্কায় প্রবেশে বাধার সৃষ্টি করে, তখনই সন্ধীর প্রস্তাব উত্থাপিত হয়, ঐ সময় কিছু মুশরিক যুবক মুসলীমদের উপর চড়াও হবার সংকল্প করে। উভয় ক্ষেত্রেই আল্লাহ তাদের সংকল্প নস্যাৎ করে দেন। এ আয়াতে আল্লাহ সেই কথাই উল্লেখ করেছেন।
হুদায়বিয়ার সন্ধী অনেক মুসলীম যুবককেও সন্তুষ্ট করতে পারেনি, তারাও মোককাবেলাকেই প্রাধান্য দিতে চেয়েছিল। আল্লাহ তায়ালা ঐ সময় সুরা ফাতাহ নাজিল করে, সন্ধীকেও বিজয় বলে ঘোষনা দিলেন।

Leave a Reply

Your email address will not be published.