বৃষ্টিকাহন
তাহ্সীনা
সাইফুল্লাহ
টাপুর টুপুর বৃষ্টি
পড়ে
নদেয় এলো বান -
শিবঠাকুরের বিয়ে হবে
তিন কন্যে দান-
সে কোন আদ্যিকালের কথকতা।
বর্ষা এলো, এলো বৃষ্টি। বৃষ্টি জলের নতুন তরঙ্গে দু’কূল উপচিয়ে মরা নদীতে
বান ডেকে যাওয়া। খাল বিল ভরে ওঠা আলপথ-মেঠোপথ বৃষ্টি
স্নানে একাকার। নতুন
পানিতে ন্যাংটো গ্রামের ছেলের দিনভর দস্যিপনা।
বৃষ্টি! রুক্ষ শুকনো
তাপক্লান্ত গুমোট পৃথিবীর শ্রিহীন চেহারা মুহুর্তের এ অনাবিল ছোঁয়ায় তাজা।
স্নানান্তে তরুণী বধুর চোখের ভেজা পলকের মতোই মোহময়।
এ দেশ যে রাধার দেশ। এই
বাংলায় রাধারা জন্ম জন্মান্তরের নিয়মে প্রেমে পরে ঐ কালো বরণ কৃষ্ণের।
মেঘের বর্ণও যে কালো। এ যে শক্তিমান পুরুষের মতই দু’কূল ছাপিয়ে আসে।
ভাসিয়ে নেয় খাল, বিল, নালা, পুকুর এমনকি বড় চেনা উঠোনের পাত কুয়োটা
পর্যন্ত! তাইতো বৃষ্টি ভালোবাসি। ভালোবাসি ঝুপসি আধার ছেয়ে যাওয়া চরাচর,
ছায়া ছায়া সমস্ত দিনব্যাপী বৃষ্টি-আধারের রাগিণী।
মেঘমেদুর সজল আকাশপানে
চেয়ে পরবাসী বাঙ্গালী মন বারেবারে ছুটে যায় ঐ বাংলায়। যেখানে শৈশবে
পাঠশালার মাঠে বৃষ্টিদিনের হঠাৎ ছুটির আনন্দে দলবেধে পা ডোবা নতুন জলে
ঝাপাঝাপি। ভেজা ঘাসে খালি পায়ে একছুট্টে মাঠের এধার থেকে ওধার। কাকভেজা,
শীতে জড়সড় অবয়ব দেখে ঠান্ডা লেগে যাবে আশঙ্কায় বকতে থাকা মা’কে ভেজা
গায়েই নির্দ্বিধায় জড়িয়ে ধরা।
অনাবিল কৈশোর, স্কুল শেষে
দল বেধে মাঠে নেমে পড়া, হুল্লোড়, পানি ছিটানো, মনের আঁশ মিটিয়ে
বৃষ্টিযাপন। জ্বর, মাথাব্যাথা, আগামী সাতদিন শয্যাশায়ী হওয়ার ভয় সর্বোপরি
বাসায় ফেরার পরের পরিনাম ভেবে বর্তমান আনন্দ নষ্ট করা? এ যে বোকার কাজ!
বড় সরল, সাদামাটা কিন্তু কি ভিষণ আপন এ জলমগ্ন স্মৃতি! আমার দেশ, আমার
প্রকৃতি, আমার মায়ের মতোই ওম ওম, মমতাময়।
তারুণ্যে বৃষ্টি এনে দিল
অন্য এক রূপ-রস-গন্ধ। ক্লাস থেকে বাড়ি ফেরার পথে হঠাৎ বৃষ্টিতে চারপাশের
সবাই যখন মাথা বাঁচাতে ব্যাস্ত ঠিক তখনই বাবার আপাত শান্ত মেয়েটা হঠাৎ
নামিয়ে দেয় রিক্সার হুড! গ্রীবা উঁচু করে মাথা তুলে তাকায় আকাশ পানে।
প্রতিটি শিহরিত রোমকূপ বরণ করে নেয় বৃষ্টি ছোঁয়ার পুলক। ভিজে একসা হয়ে
বাড়ি ফিরে সেই ছেলেবেলার মতোই মা’কে খুঁজে নেয়া। ভীষণ চম্কে রাগতে ভুলে
যাওয়া মা, হঠাৎই বড় মায়া ভরে তাকায়, গায়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, বলে
“স্নান করে নে, ঠান্ডা লেগে যাবে যে”। সেদিন ঘর জুড়ে ছড়িয়ে থাকে খিচুড়ি
আর ইলিশ মাছ ভাজার মৌতাত। ভাই-বোন সবাই মিলে ভাজা মুড়ি আর চায়ের আড্ডায়
তুফান তোলা।
যৌবন, বৃষ্টি ধোঁয়াশায়
তরুণী বাঙ্গালী মনে বেজে ওঠে কোন এক নাম না জানা অলীক সুর। বিসমিল্লাহ্
খাঁ’র সানাইয়ের মতোই করুন অবোধ্য রহস্যময় এ বোধ। বুকের আনাচ-কানাচ ছুঁয়ে
যাওয়া, দুমরে মুচরে দেয়া এক লয়। নবতর এই সুর যেন সেই অনাদী কালের
‘মেঘদূতের’ যক্ষপ্রিয়ার বেদনায় নীল হৃদিভার। দীর্ঘ দিবস, দীর্ঘ রজণী
প্রিয় বিরহের বেদনায় লীন। কালাকাল ব্যাপী যা বাংলার মাটি ছোঁয়া নরম
মেয়েগুলোর মনে জাগায় বেদনাবোধের অজানা অনুভব। ঐতিহ্য আর নাড়ির টানের
অলঙ্ঘ পরম্পরা।
বৃষ্টি, এ কেমন এক স্মৃতি!
শৈশব, কৈশোর, যৌবন সব একাকার। বৃষ্টি-ভাব যেমন বর্ণনাতীত, বৃষ্টি-রূপ
তেমনি বাঙ্ময়, আমার বাংলায়। গ্রীষ্মদিনের খরতাপে দগ্ধ তাপীত ক্লান্ত
বাংলার শহর, গ্রাম বর্ষাগমনে কি স্নিগ্ধ, কি মোহময়! কৃষ্ণচূড়ার আগুন লাগা
শিখর ছাড়িয়ে ঘন ছাই রঙা আকাশ। মুখর হৃদয় কিন্তু হঠাতই শব্দহীনতায়
আক্রান্ত, দু’চোখ খুঁজতে থাকে উপমার আশ্রয়।
পার ভাঙ্গা নদীর ধূলিধুসর তীরে
বৃষ্টিপতন। নদীর জলে জলতরঙ্গের হিল্লোল। পীচঢালা বা মেঠোপথে রিমঝিম
বৃষ্টিপতনের মেঘমল্লার।
বৃষ্টিশেষ, শুধু ঝুপসি
বুড়ি বটের পাতাগুলো জল
ঝরিয়ে চলেছে অবিরাম।
একটেরে হাটুরে
লোকটা কাঁদাপায়ে চলেছে। মাথায়
জড়ানো ভেজা গামছা, উন্মুখ মন, ঘর তাকে ডাকছে। চলমান শরীরের প্রতিটি রেখায়
এস এম সুলতানের মডেলের মত এক
বিষম তাড়া। বৌটাযে ঘরের আগল ধরে দাঁড়িয়ে,
মাথার উপর তুলে দেয়া আঁচলের প্রান্ত কামড়িয়ে, বড় বড় কালো চোখ মেলে আকুল
হয়ে চেয়ে আছে, তারই প্রতীক্ষায়, ভেজা পথের সীমানা ধরে। কালো কুলো বাংলার
মেয়েটা, বাংলার আকাশের ঐ সঘন-সজল কৃষ্ণরূপের মায়ায় সেজে আজ যে বড় মোহময়।
ঝুম বৃষ্টিতে ভিজে একসা
হওয়া ফিঙে পাখিটা তার ইলিশ মাছের লেজের মত লেজ দুলিয়ে গাছের ডালে ঝুম হয়ে
বসে আছে। এ বৃষ্টি সন্ধ্যায় পাখির কলতানেও যেন এক মন কেমন করা সুর। গোধূলী
বেলার ধোঁয়া ধোঁয়া আলো, ভেজা মাটির গন্ধে সোঁদা টান, হৃদয় আঙ্গিনায় সব
ছাপিয়ে সবলে মুখর আজ বৃষ্টি মাদল।
-আজ আষাঢ়স্য প্রথম দিবস।