হিন্দু রাজনীতির হাতে বুদ্ধগয়া মহাবোধি তীর্থভূমি
সোনা কান্তি বড়ুয়া
ভারতে পলিটিক্যাল হিন্দুধর্ম বৌদ্ধধর্মের গলা টিপে দিয়েছে অনেক আগে।
সত্য কথা বলার উপায় নেই।
‘বৌদ্ধধর্ম
তো হিন্দুধর্মের শাখা নয়’
বলতে না বলতে মৌলবাদী হিন্দুরা তেড়ে আসে।
মানুষের সকল মৌলিক অধিকার পরিপন্থী,
মানবতা বিরোধী এক কালো আইনের নাম
“বুদ্ধগয়া
মহাবোধি ম্যানেজম্যান্ট কমিটির সদস্যগণের নীতিমালা”
(ভারত,
দৈনিক পাটনা,
৮ মে,
২০০৮)।
বৌদ্ধধর্মের শত্রু রাজা পুষ্যমিত্র (খৃ: পূ: ১৫০) থেকে রাজা শশাংক (
৬৫০ খৃষ্ঠাব্দ) বুদ্ধগয়া মহাবোধি মন্দিরকে দখল করে হিন্দু মন্দিরে রুপান্তরিত
করার হীন ষড়যন্ত্র করে।
বৌদ্ধধর্মের অন্যতম শত্রু শংকরাচার্য (৮ম শতাব্দী) দিনের পর দিন
অমানবিক বৌদ্ধহত্যা যজ্ঞ চালিয়ে বৌদ্ধধর্মকে ধ্বংস করে।
মনুষ্যত্ব বিরোধী বর্বর এই হত্যাযজ্ঞ ও জেনোসাইডমূলক আইনের মারপাঁচে
ভারতের বৌদ্ধ ধর্মালম্বীদের মধ্যে চিরস্থায়ী
ক্ষতের জন্ম দিয়েছে।
তার ভয়ঙ্কর ফল বিশ্ববৌদ্ধদের শ্রেষ্ঠতম তীর্থস্থান
“বুদ্ধগয়ার
মহাবোধি মন্দির” (যেই
পবিত্র বোধিবৃক্ষের তলে বসে রাজকুমার সিদ্ধার্থ কঠোর সাধনার মাধ্যমে
সম্যক সম্বুদ্ধ বা বুদ্ধত্ব লাভ করেন) হিন্দু রাজনীতি দখলে রাখবে।
অহিংসার জন্মস্থানে
এটা হিন্দু বনাম বৌদ্ধদের সমস্যা নয়।
ভারতে একমাত্র বুদ্ধগয়ার মহাবোধি মন্দিরে হিন্দু নেতাগণের ষড়যন্ত্রে
ম্যানেজম্যান্ট কমিটির এ আইন মনুষ্য সৃষ্ঠ অথচ মনুষ্যত্ব বিরোধী।
ভারতের বিহার সরকার ক্ষতিগ্রস্ত
নির্যাতীত বৌদ্ধদেরকে তাঁদের অধিকার ফিরিয়ে দেওয়া রাষ্ঠ্রের দায়িত্ব এই
সহজ কথাটি পর্যন্ত
ভুলে গেছে।
পলিটিক্যাল হিন্দুধর্ম ভারতীয় বৌদ্ধগণের মানবাধিকার হরণ করেছে।
জাতিভেদ প্রথা ভিত্তিক হিন্দুধর্মে বৌদ্ধদের বিন্দুমাত্র ও অস্তিত্ব
নেই।
বাংলাদেশের বৌদ্ধগণ ছিল ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দুধর্মের পথের কাঁটা।
রাজা বল্লালসেনের মহামন্ত্রী হলায়ুধ মিশ্র আরবের শেখকে তোয়াজ করে
“শেখ
শুভোদয়া”
রচনা করে।
তারপর বখতিয়ার খিলজি বাংলাদেশ আক্রমন করে তার ধর্মভিত্তিক রাজনীতির
মাধ্যমে বাংলার বৌদ্ধগণ ইসলাম ধর্ম গ্রহন করেন।
ভারতবর্ষে স্বাধীন বৌদ্ধ জাতির অস্তিত্ব
ধ্বংস করে পলিটিক্যাল হিন্দুধর্মের জয়গান,
“সারা
জাঁহা সে আচ্ছা হে হিন্দুস্তান
তোমারা।”
রাজনৈতিকভাবে ভারতে আজকের বৌদ্ধগণ কি পলিটিক্যাল হিন্দুধর্মের গোলাম?
বেহায়া হিন্দুরা বুদ্ধগয়ায় মহাবোধি মন্দির দখল করতে দিনের পর দিন
মহাবোধি মন্দিরের ভেতরে শিবলিঙ্গ সহ হিন্দুদের দেবদেবী
স্থাপন
করেছে।
বৈদিক হিন্দু রাজা ইন্দ্র মহেঞ্জোদারো ও হরপ্পার প্রাগৈতিহাসিক
বৌদ্ধধর্ম (গৌতমবুদ্ধের পূর্বে আর ও ২৭ জন বৌদ্ধ ছিলেন) ধ্বংস করে
বৈদিক সভ্যতা
স্থাপন
করেন।
পলিটিক্যাল হিন্দুধর্মে বৌদ্ধসভ্যতা বিরোধি এক কালো আইন বা প্রথার নাম
‘অবতার
বাদ।’
রামায়ণের অযোধ্যা অধ্যায়ে ৩২ নম্বর শ্লোকে বুদ্ধকে গালাগাল দেবার পর
রাজনৈতিক হিন্দুধর্ম আজ আবার বুদ্ধকে হিন্দুদের নবম অবতার বানিয়ে
ভারতীয় বৌদ্ধগণের অস্তিত্ব
সমূলে ধ্বংস করেছে।
আজ ও ভগবান মহাবীর ও গুরু নানক হিন্দুদের অবতার হয় নি।
তবে ষড়যন্ত্র হরদম চলেছে।
পলিটিক্যাল হিন্দুধর্ম অবতার বানিয়ে বিশ্বের সকল ধর্মকে গিলে ফেলবে কি?
তবে বলিউডে সাধক কবিরকে রাম বা কৃষ্ণের অবতার বানিয়ে ধর্মের বাজার দখল
করে ফেলেছে।
অধ্যাপক মনীন্দ্রমোহন বসু যর্থাথই লিখেছেন,
‘অবশেষে
এই তান্ত্রিক বৌদ্ধমত তিব্বত,
নেপাল প্রভৃতি দেশে যাইয়া আশ্রয় লাভ করিয়াছে।
বৌদ্ধ ধর্মের এই পরাজয় এত সম্পূর্ণ হইয়াছিল যে,
ধর্মের সঙ্গে ধর্মগ্রন্থ
সমূহ ও ভারতবর্ষ হইতে বিতাড়িত হইয়াছে।
থেরবাদ সমপ্রদায়ের গ্রন্থগুলি
সিংহল ও ব্রহ্মদেশ হইতে আবিস্কৃত হইয়াছে,
আর মহাযান মতের শাস্ত্র সমূহ পাওয়া গিয়াছে প্রধানতঃ চীন জাপান প্রভৃতি
দেশে।
চর্যাপদের পুঁথি নেপালে আবিস্কার হইয়াছিল।
আর ইহার অনুবাদের সন্ধান পাওয়া গিয়োছে তিব্বতি ভাষায়।
এখন ভারতবর্ষে বৌদ্ধধর্মের সমাধির স্মৃতি চিহ্ন মাত্রই দৃষ্ট হইয়া থাকে।”
সুসভ্য চীন জাপান সহ পৃথিবীর অনেক দেশের কোটি কোটি জনতা বুদ্ধের ধর্ম
গ্রহন করে বৌদ্ধ হলেন।
গৌতমবুদ্ধের মহাপরিনির্বানের (মৃত্যুর) প্রায় দেড় হাজার বছর পর কতিপয়
মৌলবাদী ব্রাহ্মণ পন্ডিতের দল বুদ্ধকে রাতারাতি হিন্দুর নবম অবতার করে
সর্বগ্রাসী হিন্দু ধর্মের ফায়দা লুটে নিতে বাংলাদেশের ইতিহাস বদলে দিয়ে
সেন রাজত্ব
স্থাপনের
পর বৌদ্ধ নিধন যজ্ঞ শুরু হ’ল
।
ইতিহাসে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান দন্ডিত রাজাকারদের ক্ষমা করার পরের
ঘটনা সমূহ আমরা সবাই জানি।
ইতিহাসের আলোকে ঠিক তেমনি বিজয় সেন সুদূর কর্ণাটক থেকে এসে বাংলা দখল
করে নিল এবং বহিরাগত সেন রাজারা যে চারশ বছরের পাল সাম্রাজ্যের সমদর্শী
সংস্কৃতি ও প্রচলিত বৌদ্ধধর্মের বিলোপ ঘটিয়েছে।
বাঙালীর মুখ থেকে বাংলা ভাষা কেড়ে নিয়ে উত্তর ভারতীয় সংস্কৃতি তন্ত্র
চাপিয়ে দিল।
বলতে গেলে সমাজ জীবনের ও ব্যক্তি জীবনের সর্বত্র তখন ব্রাহ্মণ আধিপত্য।
নিপীড়িত মানবাত্মার জয়গানে মুখরিত এই চর্যাগুলো।
বাঙালী সমাজের এই করুণ ছবি দেখতে পাই ৩৩ নং চর্যায়।
”টালত
মোর ঘর নাঁহি পড়বেসী।
হাড়ীতে ভাত নাঁহি নিতি আবেশী।
এর মানে,
নিজ টিলার উপর আমার ঘর।
প্রতিবেশী নেই।
হাঁড়িতে ভাত নাই,
অথচ নিত্য ক্ষুধিত।”
সেন রাজত্ব মানে কর্ণাটকের ব্রাহ্মণ্যদের অধীনে বাংলা,
নিজ বাসভূমেই পরবাসী করে দিয়েছে বাঙালীকে।
ইতিহাসের এই অন্ধকার যুগে তবু বাঙালী দুহাতে অনন্ত
সমস্যার পাথর সরিয়ে জীবনের যাত্রা পথ ধরে হাঁটতে শুরু
করেছিল অন্যতর আলোর লক্ষ্যে।
ব্রাহ্মণ্যবাদের মাফিয়াচক্রে জাতিভেদ প্রথায় সনাতন ধর্মের মস্তক
বিক্রয় করে গণতান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মকে বৈদিক ব্রাহ্মণগণ ধ্বংস করে।
অধ্যাপক হরলাল রায় তাঁর লেখা ‘চর্যাগীতি’
গ্রনে'র
দশম পৃষ্ঠায় লিখেছেন, ‘ধর্মকোলাহলেই
বাংলা সাহিত্যের পুষ্টি ও বিকাশ।
ভারতেই আমরা দেখতে পাই ব্রাহ্মণ্য ধর্মের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দিতায় পালি
সাহিত্যের উৎপত্তি।
হিন্দুধর্মের সঙ্গে সংঘর্ষের ফলেই বৌদ্ধ ধর্ম ভারত হতে বিতারিত হয়েছিল।
আশ্চর্য্যের বিষয়,
বৌদ্ধ ধর্ম তাঁর জন্মভূমি হতে প্রায় বিলুপ্ত হয়েছিল।
মুসলমান আক্রমণের বহু পূর্বেই আমরা সারা ভারতে ব্রাহ্মণ্যধর্মের
পূনরুত্থান দেখতে পাই।
সংস্কৃত ভাষা ও চর্চা চলেছে তখন পুরোদমে।
তাঁরাই বিধান দিলেনঃ অষ্টাদশ পূরণানি রামস্যচরিতানি চ।
ভাষায়াং মানবঃ শ্রত্বা রৌরবং নরকং ব্রজেৎ।
এভাবে যাঁরা সংস্কৃতকে আত্মস'
করে নিয়েছিলেন,
তাদের পক্ষে যে অন্য ভাষা সহ্য করা অসম্ভব ছিল তা মনে করা যুক্তিযুক্ত।
সর্বগ্রাসী হিন্দুধর্ম শক্তিশালী অনার্য সভ্যতাকে আয়ত্ত করে নিজের
কুক্ষিগত করেছিলেন।
বিশেষতঃ কুমারিল ভট্ট,
শংকরাচার্য প্রমুখের নেতৃত্বে ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পূনরুত্থান আন্দোলন
আরম্ভ হয়েছিল।
এ সময়ে বৌদ্ধ সমাজের বুদ্ধিজীবিগণ নিস্তেজ
হয়ে পড়েন এবং রিক্ত সর্বশান্ত হয়ে তাঁরা ধীরে ধীরে ভারতবর্ষ হতে তিব্বত
ও আসামের দিকে সরে পড়েছেন।
ভাষা আন্দোলনের ঐতিহাসিক শেখড়ের সন্ধানে ইহা ও এই প্রসঙ্গে বিশেষভাবে
উল্লেখযোগ্য যে,
আমরা ‘বৌদ্ধ
চর্যাপদের’
সন্ধান পেলাম আজ থেকে শতবর্ষ আগে।
১৯০৭ খৃষ্টাব্দে নেপালের রাজদরবারের পুঁথিশালায় প্রাচীন পান্ডুলিপির
সন্ধান (১৯০৭ - ২০০৭) করতে গিয়ে মহামহোপধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী মহোদয়
উক্ত বৌদ্ধ চর্যাপদের মরমী সংগীতগুলো আবিস্কার করেন এবং ভাষা আন্দোলনের
আলোকে চর্যাপদ সন্ধানের ( ১৯০৭- ২০০৭) শতবার্ষিকী
।
বৌদ্ধ পাল রাজত্বের পতনের যুগে এবং ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পূনরুত্থান কালে
অস্থির
ঘটনা চাঞ্চল্যের দ্বারা চঞ্চল সেন বর্মন রাষ্ট্রের প্রবল আধিপত্যের
প্রেক্ষাপটে চর্যাপদের জন্ম আধুনিক গণতান্ত্রিক অধিকারের মেনিফিষ্টো
হিসেবে।
এর মধ্যে নিহিত রয়েছে বাঙালীর সর্বপ্রথম গনতন্ত্রের বীজ
‘বাক
স্বাধীনতার অধিকার’।
বাংলা ভাষার প্রথম ‘বিপ্লবী
মিনার’।
বৌদ্ধ কবি ও সাধকগন বিপুল প্রজ্ঞা ও ক্ষুরধার বৌদ্ধদর্শন প্রয়োগ করে
মনুষ্যত্বের উন্মেষ বিকাশে চর্যাপদের (৮ম - ১২শ শতাব্দী) এক একটি কবিতা
রচনা করতেন।
মানুষের দেশ মানুষের মনেরই সৃষ্টি।
একাদশ এবং দ্বাদশ শতাব্দী থেকে শুরু হলো সাধক চর্যাকারগনের নেতৃত্বে
সর্বপ্রথম ভাষা আন্দোলনের ইতিহাস।
যার
দুর্নিবার
জীবন- স্রোত হাজার বছরের সংকোচের জগদ্দল পাথর ভেঙ্গে এলো আমার ভাইয়ের
রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারীর উনিশশো বায়ান্ন সাল থেকে আজকের বাঙালী
ঐতিহ্যমন্ডিত আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস।
বাঙালী জাতি আবার নতুন সহস্রাব্দের আলোকে আবিস্কার করবে বাংলা ভাষার
প্রাচীনতম নিদর্শন বৌদ্ধ চর্যাপদের প্রতিটি শব্দ ও তার গভীর মর্মার্থকে।
কারণ দেশ ও ভাষা বাঙালীর কাছে নিরেট বাস্তব,
অতিশয় অপরিহার্য।
বৌদ্ধ চর্যাপদ পাঠ এবং গবেষণার সময় মনে হবে বাংলা কেবল একটি দেশ নয়,
সে একটি সভ্যতা,
একটি সংস্কৃতি,
একটি অপাপবিদ্ধ জীবনাদর্শ বা জীবন দর্শণের প্রতীক,
যার মর্মবাণী হল বিশ্ব মানবতাবাদ।
পরকে আপন করে দেখা।
বলা অপ্রাসঙ্গিক হবে না,
চর্যাপদগুলো নিয়ে যখন আমরা আলোচনায় বসি তখন সাধারণতঃ একটা প্রশ্ন জাগে
যে,
বাংলা ভাষার প্রাচীনতম নিদর্শন এ চর্যাপদগুলো নেপালে ও ভূটানে পাওয়া
গেল কেন?
চর্যাকারদের জীবনী গ্রন্থগুলোই
বা তিব্বতি ভাষায় লেখা কেন?
এ সমস্ত
সমস্যামূলক প্রশ্নের উত্তরদানে একটু আলোচনা দরকার।
প্রসঙ্গতঃ উল্লেখ্য যে,
অনেক ভারতীয় লেখক ও পন্ডিত মনে করেন যে ভারতে বৌদ্ধ রাজাদের অহিংসা ও
সন্ন্যাস নীতির কারণে ভারতীয় সামরিক শক্তির অবক্ষয়ের প্রেক্ষাপটে
মধ্যপ্রাচ্যের তুর্কি সৈন্যদল ভারত ও বাংলা জয় করে নিল।
যাঁরা ইতিহাস চর্চার সঙ্গে যুক্ত তাঁদের জিজ্ঞাস্যঃ পাঠান ও তুর্কি
সৈন্যগণ কি শুধু বৌদ্ধ বিহার,
বিশ্ববিদ্যালয় ও মন্দির ধ্বংস করল?
তাহলে পুরীর বৌদ্ধবিহারকে কারা হিন্দুর জগন্নাথ মন্দিরে দীক্ষা দিল?
বাবরি মসজিদ যারা ভেঙ্গেছে তাদের পূর্ববংশেরা অনেক বৌদ্ধবিহার দখল করে
নিয়েছে।
আমরা বৌদ্ধধর্মের স্বাধীনতা সহ বুদ্ধগয়ায় মহাবোধি মন্দিরের মুক্তি
কামনা করি।
বৌদ্ধমন্দিরকে হিন্দু মৌলবাদীনেতাগণ দখল করে আছে কেন?