রাজনীতির কোন
ঘটনাই বিচ্ছিন্ন বা সম্পর্কহীন অথবা বিধি বহির্ভূত নয়
সেতারা হাশেম
অর্থনৈতিক
স্বার্থের দ্বন্দ্বের নাম রাজনীতি । আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার উপর বিবেক
নির্ভরশীল । ভাল ও মন্দের পার্থক্য নিরূপনের নাম বিবেক । ভাল ও মন্দ হলো
আপেক্ষিক, সম্পর্কযুক্ত এবং স্থান ও কাল নির্ভর । কম মন্দকে ভাল এবং কম
ভালকে মন্দ বলা হয় । সংশ্লিষ্ট সমাজের শ্রেনী বিন্যাস সংশ্লিষ্ট শ্রেনীর
বিবেককে প্রভাবিত করে । দানবীয় কোন বুট অর্থনৈতিক শ্রেনী নয় বিধায়
মানুষের বিবেক দলিত করতে পারে না।
যন্ত্রের
ডিজাইন সাধিত উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল । যন্ত্রাংশের কাজ হলো
যন্ত্রটিকে চালু রাখা এবং যন্ত্রের কাজ হলো সাধিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন
করা । রাষ্ট্র যন্ত্র তুল্য । সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র হলো
রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের যন্ত্রাংশ । আমলাতন্ত্র কর্তায় ইচ্ছায় কীর্তন গায় ।
এখন জানা প্রয়োজন সমাজের কর্তা কারা ।
অর্থনীতি
যেমন সমাজের নিয়ন্ত্রক, তেমনি রাজনীতিরও নিয়ন্ত্রক । সামন্তবাদী সমাজে
জমিদার ছিলেন সমাজের কর্তা এবং লাঠিয়ালেরা ছিল তার শক্তি । অনুরূপ ভাবে
লুটেরা বা বুর্জোয়া সমাজে লুটেরা বা পুজিপতি হলো সমাজের কর্তা এবং
সামরিক ও বেসামরিক আমলারা হলো তাদের লাঠিয়াল ।
“এক-এগার”
অর্থনীতি ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রকের পরিবর্তন ঘটিয়েছে । লুটেরাদের থেকে
অর্থনীতি ও রাজনীতি মুক্ত করে পুজির হাতে ন্যস্ত করেছে । ফলে বিএনপি ও
আওয়ামী লীগে সংষ্কারপন্থী ও নেত্রীপন্থী বিভাজন দেখা দিয়েছে ।
লুটপাট
ছাড়া প্রাথমিক পুজি সংগ্রহ সম্ভব নয় । এশিয়া-আফ্রিকা লুট করে ইউরোপ এবং
ল্যাটিন আমেরিকা লুট করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক পুজি সংগ্রহ হয়েছিল ।
বৃটিশের সাব-কনট্র্যাকটারী ও গান্ধীর বৃটিশ-পণ্য বর্জন আন্দোলনের
মাধ্যমে ভারতীয় প্রাথমিক পুজি সংগঠিত হয় । কিন্তু বাংলাদেশের প্রাথমিক
পুজি সংগঠিত হয়েছে জাতির পিতাকে হত্যা করে এবং দেশীয় সম্পদ লুট করে ।
বাংলাদেশে
লুটের কার্যক্রম এমন এক পর্যায় উপনীত হয়েছিল যে সমাজের
“ইলাষ্টিক
লিমিট”
অতিক্রমের উপক্রম ঘটতে যাচ্ছিল । তাই পুজি নিজ নিরাপত্তার স্বার্থে
সুশীল সমাজ ও সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে আরো লুটে আগ্রহী গোষ্ঠিকে
হটিয়ে দেশের কর্তৃত্ব গ্রহন করে । যার নাম
“এক-এগার”
। পুজির নিরাপত্তার স্বার্থেই সংবিধান সংশোধন, রাজনীতির সংষ্কার, আইনের
শাসন ও বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অতি জরুরী হয়ে পড়েছে । অন্যথায়
বাংলাদেশ নেপালের মতো সশস্ত্র ভূমিকায় চলে যাবে, যা আন্তর্জাতিক,
আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ শক্তি চায় না ।
প্রাথমিক
পুজি সংগ্রহের লক্ষ্যে লুটপাটের স্বার্থে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, সংবিধান
পরিবর্তন, রাজাকার পুনর্বাসন, জিয়া ও এরশাদের সামরিক সরকার এবং বিএনপি
ও জাতীয় পার্টি গঠন করতে হয়েছে । এরশাদের উপর জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে এই
লুটেরা গোষ্ঠিই আবার পরিবার কেন্দ্রীক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে অবাধে
লুটপাট চালাতে থাকে । জনতা রাজনীতিবীদের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে ।
ফলে জনতা নিজেরাই কনসার্ট, শনির আখড়া ও ফুলবাড়ী সৃষ্টি করে । বিগত ২০০৭
সালের ২২শে জানুয়ারী একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিলে দেশ
গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হোতে থাকে ।
“এক-এগার”
জাতিকে গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা করে ।
জিয়া ও
এরশাদ ক্ষমতা দখল করে ছিলেন লুটেরা অর্থনীতি ও লুটেরা গোষ্ঠিকে
প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে । বিপরীতে
“এক-এগার”
সেনাবাহিনীর সহায়তায় লুটেরা গোষ্ঠিকে হটিয়ে পুজিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠ করে
। “এক-এগার”
এর ঘটনায় সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল না করে পুজির লাঠিয়ালের ভূমিকা পালন করে
। ফলে অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটে । আইনের ডক্টার
আলোচ্য এই গুণগত পরিবর্তন সমর্থন করে অন্যায় কিছু করেছেন বলে মনে হয় না
।
লুটেরা
গোষ্ঠির সদস্য হলো ১২ লক্ষ কোটিপতি । এই কোটিপতিদের পরিধিতে বিরাজ
করছেন বুর্জোয়া দলগুলির উচ্ছিষ্টভোগী কর্মীবৃন্দ । কোটিপতিদের একটা অংশ
পুজিপতিতে রূপান্তর হয়েছে । পুজির বৈশিষ্ট অনুযায়ী রাজনৈতিক সংষ্কার,
আইনের শাসন ও গণতন্ত্র তদের কাম্য । আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ
শক্তি তাদের অনুকুলে । তাই লুটেরা গোষ্ঠি আত্মসমর্পন করতে বাধ্য ।
লুটেরা গোষ্ঠির এক নেত্রীর বোধোদয় ঘটেছে বিধায় আত্মসমর্পন করেছেন ।
অন্য নেত্রী আত্মসমর্পনের পথে । তাই দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক স্রোত
লিবারেল বুর্জোয়া গোষ্ঠির অনুকুলে ।
রাজনৈতিক
দলের নিবন্ধীকরণের যে নীতিমালা জারী হোতে যাচ্ছে, সেই অনুযায়ী বিএনপি ও
জাতীয় পার্টিসহ বেশ কিছু ইসলামিক দল গঠনতন্ত্র পরিবর্তন না করলে
নিবন্ধন থেকে বাধ পড়বে । ফলে তাদের পক্ষে আগামী নির্বাচনে অংশ গ্রহন করা
সম্ভব হবে না । আওয়ামী লীগ তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য আগ্রহী ।
লুটেরা ও
উচ্ছিষ্টভোগীদের উপর সাধারন মানুষ ক্ষিপ্ত । ভোটের ১৩% ধর্মীয়
সংখ্যালঘুদের ভোট । ভোট দেয় না বিধায় বিএনপি সংখ্যালঘুদেরকে বিতারিত
করতে চায় । ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তীতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিপদের
সময় আওয়ামী লীগ তাদেরকে বাচাতে যায়নি । পরিসংখ্যানে দেখা যায় আওয়ামীরাই
শত্রু সম্পত্তি সব চেয়ে বেশী দখল করেছে । তাই আগামী নির্বাচনে
সংখ্যালঘুদের ভোট আওয়ামী বাক্সে নাও যেতে পারে । বিএনপির করুন অবস্থা
জেনেও আওয়ামীরা একক ভাবে নির্বাচন করতে সাহস পাচ্ছে না । তারা ১৪-দলের
সাথে জোট বেধে নির্বাচন করতে চায় ।
বুর্জোয়া
গণতন্ত্রে আস্থাবান এবং তুলনামূলক ভাবে সদ, লুটেরা দলগুলির এতদকালের
উপেক্ষিত ও অবহেলিত কর্মীবৃন্দের আগামী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা
দেখা দিয়েছে । লিবারেল এই বুর্জোয়ারা আগামীতে দেশের নেতৃত্বে আসছেন বলে
মনে হচ্ছে । সম্ভাব্য নেতৃত্ব দানকারী এই লিবারেল শক্তি, সৃষ্ট
অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসের কার্যকরি কোন পদক্ষেপ গ্রহনে ব্যর্থ হলে দেশে
গণ-বিস্ফোরণ ঘটবে ।
বিভিন্ন
রাজনৈতিক মতাদর্শের লোক নিয়ে সমাজ ও দেশ গঠিত । সেনা-বাহিনী সমাজের অংশ
। বহিঃশক্তি ও অভ্যন্তরীণ শক্তির হামলা থেকে দেশকে রক্ষা করা
সেনাবাহিনীর কাজ । সেনা-বাহিনী বহির শত্রুর সম-পর্যায়ের শক্তি অর্জনে
সক্ষম না হলেও অভ্যন্তরীন শত্রুকে মোকাবেলা করার জন্য রাখা প্রয়োজন ।
দেশের বর্তমান অভ্যন্তরীন শত্রু মৌলবাদ ও লুটেরা গোষ্ঠি, সেনা-বাহিনী
নয় । তাছাড়া বিকল্প কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা না করে সেনা-বাহিনী
বিলুপ্তির চিন্তা অবাস্তব ।