সদালাপ: দেশী-বিদেশী বাংলাদেশীদের -জার্নাল

Shodalap: An inclusive e-journal for Bangladeshis at home and abroad
 

 

 

 

রাজনীতির কোন ঘটনাই বিচ্ছিন্ন বা সম্পর্কহীন অথবা বিধি বহির্ভূত নয়

সেতারা হাশেম

 

অর্থনৈতিক স্বার্থের দ্বন্দ্বের নাম রাজনীতি । আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার উপর বিবেক নির্ভরশীল । ভাল ও মন্দের পার্থক্য নিরূপনের নাম বিবেক । ভাল ও মন্দ হলো আপেক্ষিক, সম্পর্কযুক্ত এবং স্থান ও কাল নির্ভর । কম মন্দকে ভাল এবং কম ভালকে মন্দ বলা হয় । সংশ্লিষ্ট সমাজের শ্রেনী বিন্যাস সংশ্লিষ্ট  শ্রেনীর বিবেককে প্রভাবিত করে । দানবীয় কোন বুট অর্থনৈতিক শ্রেনী নয় বিধায় মানুষের বিবেক দলিত করতে পারে না।

 

যন্ত্রের ডিজাইন সাধিত উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল । যন্ত্রাংশের কাজ হলো যন্ত্রটিকে চালু রাখা এবং যন্ত্রের কাজ হলো সাধিত উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করা । রাষ্ট্র যন্ত্র তুল্য । সামরিক ও বেসামরিক আমলাতন্ত্র হলো রাষ্ট্রীয় যন্ত্রের যন্ত্রাংশ । আমলাতন্ত্র কর্তায় ইচ্ছায় কীর্তন গায় । এখন জানা প্রয়োজন সমাজের কর্তা কারা ।

 

অর্থনীতি যেমন সমাজের নিয়ন্ত্রক, তেমনি রাজনীতিরও নিয়ন্ত্রক । সামন্তবাদী সমাজে জমিদার ছিলেন সমাজের কর্তা এবং লাঠিয়ালেরা ছিল তার শক্তি । অনুরূপ ভাবে লুটেরা বা বুর্জোয়া সমাজে লুটেরা বা পুজিপতি হলো সমাজের কর্তা এবং সামরিক ও বেসামরিক আমলারা হলো তাদের লাঠিয়াল । এক-এগার  অর্থনীতি ও রাজনীতির নিয়ন্ত্রকের পরিবর্তন ঘটিয়েছে । লুটেরাদের থেকে অর্থনীতি ও রাজনীতি মুক্ত করে পুজির হাতে ন্যস্ত করেছে । ফলে বিএনপি ও আওয়ামী লীগে সংষ্কারপন্থী ও নেত্রীপন্থী বিভাজন দেখা দিয়েছে ।

 

লুটপাট ছাড়া প্রাথমিক পুজি সংগ্রহ সম্ভব নয় । এশিয়া-আফ্রিকা লুট করে ইউরোপ এবং ল্যাটিন আমেরিকা লুট করে যুক্তরাষ্ট্রের প্রাথমিক পুজি সংগ্রহ হয়েছিল । বৃটিশের সাব-কনট্র্যাকটারী ও গান্ধীর বৃটিশ-পণ্য বর্জন আন্দোলনের মাধ্যমে ভারতীয় প্রাথমিক পুজি সংগঠিত হয় । কিন্তু বাংলাদেশের প্রাথমিক পুজি সংগঠিত হয়েছে জাতির পিতাকে হত্যা করে এবং দেশীয় সম্পদ লুট করে ।

 

বাংলাদেশে লুটের কার্যক্রম এমন এক পর্যায় উপনীত হয়েছিল যে সমাজের ইলাষ্টিক লিমিট অতিক্রমের উপক্রম ঘটতে যাচ্ছিল । তাই পুজি নিজ নিরাপত্তার স্বার্থে সুশীল সমাজ ও সামরিক বাহিনীর সমর্থন নিয়ে আরো লুটে আগ্রহী গোষ্ঠিকে হটিয়ে দেশের কর্তৃত্ব গ্রহন করে । যার নাম এক-এগার । পুজির নিরাপত্তার স্বার্থেই সংবিধান সংশোধন, রাজনীতির সংষ্কার, আইনের শাসন ও বুর্জোয়া গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা অতি জরুরী হয়ে পড়েছে । অন্যথায় বাংলাদেশ নেপালের মতো সশস্ত্র ভূমিকায় চলে যাবে, যা আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ শক্তি চায় না ।

 

প্রাথমিক পুজি সংগ্রহের লক্ষ্যে লুটপাটের স্বার্থে বঙ্গবন্ধুকে হত্যা, সংবিধান পরিবর্তন, রাজাকার পুনর্বাসন, জিয়া ও এরশাদের সামরিক সরকার এবং বিএনপি ও জাতীয় পার্টি গঠন করতে হয়েছে । এরশাদের উপর জনতা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে এই লুটেরা গোষ্ঠিই আবার পরিবার কেন্দ্রীক রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করে অবাধে লুটপাট চালাতে থাকে । জনতা রাজনীতিবীদের উপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলে । ফলে জনতা নিজেরাই কনসার্ট, শনির আখড়া ও ফুলবাড়ী সৃষ্টি করে । বিগত ২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারী একতরফা নির্বাচন অনুষ্ঠানের ঘোষণা দিলে দেশ গৃহযুদ্ধের দিকে ধাবিত হোতে থাকে । এক-এগার জাতিকে গৃহযুদ্ধ থেকে রক্ষা করে ।

 

জিয়া ও এরশাদ ক্ষমতা দখল করে ছিলেন লুটেরা অর্থনীতি ও লুটেরা গোষ্ঠিকে প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে । বিপরীতে এক-এগার সেনাবাহিনীর সহায়তায় লুটেরা গোষ্ঠিকে হটিয়ে পুজিকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠ করে । এক-এগার এর ঘটনায় সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল না করে পুজির লাঠিয়ালের ভূমিকা পালন করে । ফলে অর্থনীতি, সমাজ ও রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন ঘটে । আইনের ডক্টার আলোচ্য এই গুণগত পরিবর্তন সমর্থন করে অন্যায় কিছু করেছেন বলে মনে হয় না ।

 

লুটেরা গোষ্ঠির সদস্য হলো ১২ লক্ষ কোটিপতি । এই কোটিপতিদের পরিধিতে বিরাজ করছেন বুর্জোয়া দলগুলির উচ্ছিষ্টভোগী কর্মীবৃন্দ । কোটিপতিদের একটা অংশ  পুজিপতিতে রূপান্তর হয়েছে । পুজির বৈশিষ্ট অনুযায়ী রাজনৈতিক সংষ্কার, আইনের শাসন ও গণতন্ত্র তদের কাম্য । আন্তর্জাতিক, আঞ্চলিক ও অভ্যন্তরীণ শক্তি তাদের অনুকুলে । তাই লুটেরা গোষ্ঠি আত্মসমর্পন করতে বাধ্য । লুটেরা গোষ্ঠির এক নেত্রীর বোধোদয় ঘটেছে বিধায় আত্মসমর্পন করেছেন । অন্য নেত্রী আত্মসমর্পনের পথে । তাই দেখা যাচ্ছে রাজনৈতিক স্রোত লিবারেল বুর্জোয়া গোষ্ঠির অনুকুলে ।

 

রাজনৈতিক দলের নিবন্ধীকরণের যে নীতিমালা জারী হোতে যাচ্ছে, সেই অনুযায়ী বিএনপি ও জাতীয় পার্টিসহ বেশ কিছু ইসলামিক দল গঠনতন্ত্র পরিবর্তন না করলে নিবন্ধন থেকে বাধ পড়বে । ফলে তাদের পক্ষে আগামী নির্বাচনে অংশ গ্রহন করা সম্ভব হবে না । আওয়ামী লীগ তাদের গঠনতন্ত্র সংশোধনের জন্য আগ্রহী ।

 

লুটেরা ও উচ্ছিষ্টভোগীদের উপর সাধারন মানুষ ক্ষিপ্ত । ভোটের ১৩% ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের ভোট । ভোট দেয় না বিধায় বিএনপি সংখ্যালঘুদেরকে বিতারিত করতে চায় । ২০০১ সালের নির্বাচন পরবর্তীতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিপদের সময় আওয়ামী লীগ তাদেরকে বাচাতে যায়নি । পরিসংখ্যানে দেখা যায় আওয়ামীরাই শত্রু সম্পত্তি সব চেয়ে বেশী দখল করেছে । তাই আগামী নির্বাচনে সংখ্যালঘুদের ভোট আওয়ামী বাক্সে নাও যেতে পারে । বিএনপির করুন অবস্থা জেনেও আওয়ামীরা একক ভাবে নির্বাচন করতে সাহস পাচ্ছে না । তারা ১৪-দলের সাথে জোট বেধে নির্বাচন করতে চায় ।

 

বুর্জোয়া গণতন্ত্রে আস্থাবান এবং তুলনামূলক ভাবে সদ, লুটেরা দলগুলির এতদকালের উপেক্ষিত ও অবহেলিত কর্মীবৃন্দের আগামী নির্বাচনে জয়ী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে । লিবারেল এই বুর্জোয়ারা আগামীতে দেশের নেতৃত্বে আসছেন বলে মনে হচ্ছে ।  সম্ভাব্য নেতৃত্ব দানকারী এই লিবারেল শক্তি, সৃষ্ট অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসের কার্যকরি কোন পদক্ষেপ গ্রহনে ব্যর্থ হলে দেশে গণ-বিস্ফোরণ ঘটবে ।

 

বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের লোক নিয়ে সমাজ ও দেশ গঠিত । সেনা-বাহিনী সমাজের অংশ । বহিঃশক্তি ও অভ্যন্তরীণ শক্তির হামলা থেকে দেশকে রক্ষা করা সেনাবাহিনীর কাজ । সেনা-বাহিনী বহির শত্রুর সম-পর্যায়ের শক্তি অর্জনে সক্ষম না হলেও অভ্যন্তরীন শত্রুকে মোকাবেলা করার জন্য রাখা প্রয়োজন । দেশের বর্তমান অভ্যন্তরীন শত্রু মৌলবাদ ও লুটেরা গোষ্ঠি, সেনা-বাহিনী নয় । তাছাড়া বিকল্প কর্ম সংস্থানের ব্যবস্থা না করে সেনা-বাহিনী বিলুপ্তির চিন্তা অবাস্তব ।

 Your comments

সদালাপ পড়ুন, সদালাপে লিখুন

Published on: June 16, 2008   Cite as: shodalap.com/SH_Rajniti_ghotona.htm

Disclaimer: The opinions/views expressed in the articles are solely of the writers'. Shodalap neither verifies nor endorses the claims and/or facts that appear in the writings.