সদালাপ: দেশী-বিদেশী বাংলাদেশীদের -জার্নাল

Shodalap: An inclusive e-journal for Bangladeshis at home and abroad
 

 

 

 

কারকাদি

মেস্তা পাটের ফল থেকে তৈরী সুদানীজ চা ও বাংলাদেশে এর ব্যবহার উপযোগিতা

রাজ্জাক রাজা

 

সুদানের চায়ের দোকানে চা ও কফির বাইরে সতেজ কারক পানীয় হিসেবে যে জিনিসটি সবচেয়ে বেশী বিক্রি হয় তা হল এক প্রকার বর্ষজীবী উদ্ভিদের ফলের উপ-বৃত্তি থেকে তৈরী পানীয় কারকাদি(KAR-kah-day )।সুদানের সর্বত্র চা, কফি ও শিশার দোকানে সমান তালে কারকাদি বিক্রি হয়। অবশ্য কারকাদি কেবল সুদানে নয় বরং এটা সমগ্র আফ্রিকা অঞ্চলেরই জনপ্রিয় পানীয়। পূর্ব আফ্রিকার দেশ সমূহে একে সুদানী চা বলা হয়। এদের কাছে চা হল দুই প্রকার--চাইনিজ চা ও সুদানীজ চা। আমাদের দেশে যে চা উৎপন্ন হয় তা এখানে চাইনিজ চা নামে পরিচিত। আর আমাদের দেশের মেস্তা পাটের ফলের উপবৃত্তি (ক্যালিক্স) থেকে তৈরী পানীয়কে এরা সুদানী চা বলে।

 

কারকাদি জবা পরিবারের উদ্ভিদ। আমাদের দেশে এই প্রকারের চারা গাছ পাট হিসেবে আবাদ করা হয়। ভারতীয় উপমহাদেশে কারকাদিকে বলে মেস্তা পাট। এই পাটের পাতা ও ফুল দিয়ে আচার চাটনি বা খাটা তৈরীর কথা শুনেছিলাম। কিন্তু সতেজ কারক পানীয় হিসেবে এটা পৃথিবীতে বিশেষ করে আফ্রিকা অঞ্চলে এত জনপ্রিয় তা সুদানে এসেই জানতে পারলাম। সুদানের সকল মুদীর দোকানে কারকাদি কিনতে পাওয়া যায়। বস্তুতঃ সুদানে কারকাদি ছাড়া কোন মুদির দোকানই হয় না। কিছুদিন আগে একটি মুদির দোকানে উৎসুক হয়ে কয়েকটি শুকনো কারকাদি উপবৃত্তি খেয়ে দেখেছিলাম। কিন্তু এটা পানীয় হিসেবে আজ খেয়ে দেখে মনে হল এর জনপ্রিয়তার পিছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে।

 

কারকাদির ইংরেজী নাম হল রোজেলী (Roselle)। এর বৈজ্ঞানিক নাম হল হিবিসকাস সাবডারিফা (Hibiscus sabdariffa) এটা হল মালভেসী পরিবারের সদস্য। আমাদের দেশে জন্মে এমন সব জবা ফু্লই মালভেসি পরিবারের সদস্য। নুতন আবিষ্কৃত আমেরিকা ছাড়া বিশ্বের অন্যসh অঞ্চলেই হিবিসকাস জন্মে। তবে এটা হল ক্রান্তীয় আবহাওয়ার উদ্ভিদ। এই উদ্ভিদ সাধারণত এক বর্ষজীবী ।তবে এর অনেক প্রজাতি বহু বছর পর্যন্ত বেঁচে থাকে। সুদানীজ চায়ের হিবিসকাস এক বর্ষজীবী।

 

 

কারকাদির ভারত উপমহাদেশের নাম হল মেস্তা যা পাটের একটি জাত হিসেবে বর্ষার প্রারম্ভে গরম আবহাওয়া বপন করা হয়। অস্ট্রেলিয়ায় এর নাম রোজেলা ফল(rosella frui)। মায়ানমারে একে বলে চীন বাউং (chin baung), থাইল্যান্ডে এর নাম ক্রাজীব (krajeab), সেনেগাল, মালি,নাইজার, কংগো ও ফ্রান্সে একে বলে বিশাপ (bissap), মালির কিছু কিছু অঞ্চলে কারকাদিকে দাহ বা দাহ ব্লেনী (dah or dah bleni) বলে। কারকাদির গাম্বিয়ান নাম হল উনজো (wonjo) এবং নাইজেরিয়ায় এর নাম জোবো (zobo ), নমিবিয়া অঞ্চলে কারকাদির পরিচিতি হল ওমুটেটে() নামে,। ক্যারিবিয়ান অঞ্চলে একে বলে সোরেল (sorrel)। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বিশেষ করে মালয়েশিয়ায় কারকাদির নাম হল আসাম পেইয়া বা আসাম সুসুর (asam paya or asam susur)। কারকাদির চাইনিজ নাম হল লুয়ো শীন হুয়া (Luo Shen Hua) .

 

আমাদের দেশে মেস্তা পাট হিসেবে আবাদ করা হলেও এর ঔষুধী গুণ প্রচুর যা হয়তো আমাদের জানা নেই। পাটের বাইরে বাংলাদেশে মেস্তার পাতা শাক হিসেবে খাওয়া হয়। এর ফল কাচা অবস্থায় আচার ও চাটনি তৈরীতে ব্যবহার করা হয়। কিন্তু বৈজ্ঞানিক গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে মেস্তার ফল ও ফলের প্রবৃত্তিতে প্রচুর পরিমাণে উচ্চ রক্তচাপ নিরোধোক উপাদান রয়েছে। তা ছাড়াও এটা বহুমূত্র,কোষ্ঠ কাঠিন্য,বদহজম উপশমকারী এবং ক্যান্সারের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হয়। আরব অঞ্চলে কারকাদি শর্দি-কাশির ঔষধ হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কারকাদিতে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন সি রয়েছে। থাইল্যান্ডে কারকাদির পাতা বা শুকনো ফলের উপ-বৃত্তি সাধারণ চায়ের সাথে মিশিয়ে এক প্রকারের সুস্বাদু মদ তৈরী হয়। কারকাদি ইউরোপে রাসায়নিক রংগের পরিপূরক হিসেবে ব্যবহার করা হয়। বিশেষ করে খাদ্য দ্রব্য যেমন,চকোলেট,তরল পানীয় ও ফাস্ট ফুডের মনোহারী রঞ্জক হিসেবে কারকাদি ব্যবহার করা হয়।

 

সমগ্র আরব জগতে কারকাদি একটি সতেজকারক কোমল পানীয়। এটা গরম কিংবা ঠাণ্ডা পানীয় হিসেবে আরব উপদ্বীপ ও আফ্রিকার দেশ সমূহে ব্যবহার করা হয়। মিশনে একে বলা হয় লাল চা। এবং মিশরের পরিব্রাজকগণ কারকাদি না পান না করে তাদের মিশর ভ্রমণ শেষ করেন না।

 

পৃথিবীতে সব চেয়ে উৎকৃষ্টমানের কারকাদি উৎপাদিত হয় সুদানে। কিন্তু সুদানে উৎপাদনের পরিমা কম। তাছাড়া সুদান কারকাদির প্রক্রিয়াজাতেও পারদর্শী নয়। কিন্তু বিশ্ববাজারে কারকাদির দারুণ চাহিদা থাকার কারণে পৃথিবীর অনেক ক্রান্তীয় আবহাওয়ার দেশ কারকাদি উৎপাদনে এগিয়ে এসেছে।

 

কারকাদি উৎপাদনে চীন ও থাইল্যান্ডেই পৃথিবীতে শীর্ষস্থান দখল করে আছে। মালয়েশিয়া নব্বই এর দশক থেকে কারকাদি বা রোজেলী উৎপাদন ও রপ্তানী শুরু করে। বর্তমানে মালয়েশিয়ায় পানীয় হিসেবে কারকাদি যথেষ্ট জনপ্রিয়।

 

আফ্রিকান দেশগুলোর মধ্যে মিশর, সেনেগাল, মালি, তানজানিয়া প্রভৃতি দেশে কারকাদি বাণিজ্যিক ভাবে চাষ করা হয়। কেরিবিয়ান রাষ্ট্রগুলোর মধ্যে মেক্সিকো, জামাইকাতে কারকাদির চাষ হয়। যুক্তরাষ্ট্রের কেলিফোর্নিয়ায় কারকাদিকে বলা হয় ফ্লোর ডি জামাইকা এবং এখানকার বলবর্ধকখাদ্য বস্তুর মধ্যে কারকাদি অন্যতম।

 

সুদানের সামাজিক অনুষ্ঠানে, বিশেষ করে বিয়ের আসরে কারকাদি পরিবেশন একটি সাধারণ রীতি। মালি, সেনেগালসহ অনেক আফ্রিকান দেশে কারকাদির চা ফুটপাতের দোকান থেকে শুরু করে পাঁচতারা হোটেল পর্যন্ত পাওয়া যাবে। শীতের রাতে এক গ্লাস কারকাদি শীতার্ত মানুষকে বড়ই আরাম দান করে।

 

আমি সুদানের চায়ের দোকান থেকে কারকাদি না খেয়ে মুদির দোকান থেকে কিনে তা নিয়মিত চায়ের মতো করে পান করা শুরু করেছি। যে মেস্তা পাটকে আমরা কেবল পাট আকারেই দেখতে অভ্যস্ত তার ফলের উপ-বৃত্তিকে শুকিয়ে এভাবে বাজার জাত করা যায় এবং এটা এমন সুস্বাদু  ও স্বাস্থ্য রক্ষাকারী পানীয় হতে পারে তা আগে আমার জানা ছিল না এবং আমি মনে করি, বাংলাদেশের মানুষের কাছে আজও তা অপরিচিত রয়ে গেছে। স্বাস্থ্যকর পার্শ্ব প্রতিক্রিয়াহীন উপাদান সমূহ থাকায় বাংলাদেশে চায়ের পরিবর্তে আমরা মেস্তা বা কারকাদিকে জনপ্রিয় করতে পারি। উত্তরোত্তর রাসায়নিক রংকে খাদ্য বস্তু থেকে বিদায় করার যে সংস্কৃতি শুরু হচ্ছে, তাতে আমাদের দেশের ঐতিহ্যবাহী মেস্তা ফলের উৎপাদন বিশ্ব বাজারে বড় একটি স্থান দখল করতে পারে। তা ছাড়া আইয়ুর্ব্যদি চিকিৎসা জগতে মেস্তার ব্যবহার বড় উপকারে আসতে পারে। আমাদের দেশের হাজার হাজার দরিদ্র মানুষ আর্থিক অনাটনের জন্য আধুনিক এলোপ্যাথিক চিকিৎসা গ্রহণে অপারগ। সেক্ষেত্রে মেস্তা ফলের বহুমুখী ব্যবহার করে আমরা অনেক রোগের উপশম করতে পারি।

 

ওয়াউ, পশ্চিম বাহারুল গজল, দক্ষিণ সুদান

(লেখক সুদানে জাতি সংঘ শান্তি রক্ষা মিশনে কর্মরত একজন পুলিশ অফিসার)

 Your comments

সদালাপ পড়ুন, সদালাপে লিখুন

Published on: June 12, 2008   Cite as: shodalap.com/RR_karkadi.htm

Disclaimer: The opinions/views expressed in the articles are solely of the writers'. Shodalap neither verifies nor endorses the claims and/or facts that appear in the writings.